ইমাম রেযা (আ.)’র জন্ম-বার্ষিকী পালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী: মাজারে ৩০ লাখ অনুরাগীর ভিড়

ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পালিত হচ্ছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম রেযা (আ.)’র পবিত্র জন্ম-বার্ষিকী।এই শুভ জন্মদিন উপলক্ষে ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে অবস্থিত এই মহান ইমামের মাজার জিয়ারত করতে ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে এসেছেন ত্রিশ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আজ সন্ধ্যা থেকেই ধর্মপ্রাণ ইরানিদের মধ্যে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারা উতসব পালন করছেন দান-খয়রাতসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।

হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ ইরানি হাতে ফুলসহ মাশহাদের পবিত্র মাজারের দিকে এগিয়ে-আসা শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন।  অনেকেই এই মহান ইমামের জন্মদিনে পবিত্র মাশহাদ শহরে আসার জন্য বহু দিন আগ থেকে পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছেন।ইরানের বিভিন্ন ধর্মীয়-কেন্দ্রসহ মসজিদগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মৌলুদখানি ও বিতরণ করা হয়েছে নানা ধরনের মিষ্টি এবং শরবত। অনেকেই এই শুভ দিনকে বেছে নিয়েছেন বিয়ের উতসব অনুষ্ঠানের  জন্য।

ইরানের ধর্মীয় শহর কোম ও শিরাজ নগরীতেও উতসবের বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। কোমে রয়েছে ইমাম রেযা (আ.)’র বোন হযরত ফাতিমা মাসুমা (সালামুল্লাহি আলাইহা)’র মাজার এবং শিরাজে রয়েছে ভাই শাহ চেরাগ (র.)’র মাজার।

ইসলামের বিশ্ববিশ্রুত ১২ জন নিষ্পাপ ইমামের মধ্যে ইমাম আলী ইবনে মুসা রেযা (আ.) ছিলেন অষ্টম। বংশধারার দিক থেকে তিনি  হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)’র নাতির নাতির পুত্র তথা ইমাম বাকির (আ.)’র নাতি ইমাম মুসা কাযিম (আ.)’র পুত্র। অর্থাত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ছিলেন তাঁর দাদা। বারো ইমামের মধ্যে সর্বশেষ ইমাম হলেন মানবজাতির সর্বশেষ ত্রাণকর্তা ইমাম মাহদী (আ.)।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ইরানের খোরাসানে তাঁর শরীরের একটি অংশকে তথা তাঁর পবিত্র বংশধারা বা আহলে বাইতের একজন সদস্যকে দাফন করা হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। ইমাম রেযা (আ.)’র পবিত্র মাজার থাকার কারণেই খোরাসান অঞ্চলটি মাশহাদ নামে খ্যাতি অর্জন করেছে।এই মহান ইমামের জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক মুবারকবাদ।

১৮৩ হিজরিতে খলিফা হারুনের কারাগারে পিতা ইমাম কাজিম (আ.)’র শাহাদতের পর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মুসলিম উম্মাহর ইমামতের ঐশী দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইমাম রেযা (আ.)।

ইমাম রেযা (আ.)’র পিতা ইমাম মুসা কাজিম (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, আমার বাবা ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আমাকে বার বার বলতেন যে, আলে মুহাম্মাদের আলেম বা জ্ঞানী হবে তোমার বংশধর। আহা! আমি যদি তাঁকে দেখতে পেতাম!তাঁর নামও হবে আমিরুল মু’মিনিন (আ.)’র নাম তথা আলী।

প্রায় হাজার বছর আগে লিখিত ‘শাওয়াহেদুন্নবুওয়াত’ নামক বইয়ে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, যারা ইরানের খোরাসানে অবস্থিত (যার বর্তমান নাম মাশহাদ) ইমাম রেযা (আ.)’র মাজার জিয়ারত করবে তারা বেহেশতবাসী হবে। বিশিষ্ট কবি ও আধ্যাত্মিক সাধক মাওলানা আবদুর রহমান জামির লিখিত এই বইটি বহু বছর আগে বাংলা ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে (মাওলানা মহিউদ্দিনের মাধ্যমে) (পৃ.১৪৩-১৪৪)। [এ বইয়ের ২৭২ পৃষ্ঠায় পবিত্র কোম শহরে অবস্থিত হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)’র পবিত্র মাজার জিয়ারত সম্পর্কেও একই কথা বলা হয়েছে। এই ফাতিমা মাসুমা ছিলেন ইমাম রেযা-আ.’র ছোট বোন। মাসুমা বা নিষ্পাপ ছিল তাঁর উপাধি। অসুস্থ ভাইকে দেখার উদ্দেশ্যে তিনি মদীনা থেকে  ইরানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এ সময় ইরানের ভেতরে তার কাফেলা সরকারি অনুচরদের হামলার শিকার হয়। তিনি নিজেও আহত হন এবং কোম নামক গ্রামে আশ্রয় নেন ও পরে সেখানেই ইন্তিকাল করেন।  ]

আব্বাসিয় খলিফা মামুন ইমাম রেযা (আ.)-কে মদীনা থেকে  খোরাসানের মার্ভে (বর্তমানে তুর্কমেনিস্তানের একটি শহর) আসতে বাধ্য করেছিলেন। মার্ভ ছিল মামুনের অস্থায়ী রাজধানী।  রাজনৈতিক অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১ হিজরিতে হযরত ইমাম রেযা (আ.)-কে যুবরাজ তথা নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করে আব্বাসিয় খলিফা মামুন।
এ উপলক্ষে ব্যাপক উতসবের আয়োজন করেছিল ধূর্ত খলিফা মামুন। আসলে তার এই কাজের উদ্দেশ্য ছিল মহানবীর (দ.) পবিত্র বংশধারা বা আহলে বাইতের অনুসারীদের মন জয় করে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা এবং আহলে বাইতের পবিত্র ভাব-মর্যাদাকে কালিমালিপ্ত করা। উতসব অনুষ্ঠানে দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এবং মামুনের নিজ পুত্র আব্বাস ও সাধারণ জনতা ভবিষ্যত খলিফা হিসেবে হযরত ইমাম রেযা (আ.)’র প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। এই মহান ইমামের নাম-খচিত মুদ্রা চালু করা হয়। এ ছাড়াও আব্বাসিয়দের রাষ্ট্রীয় রঙ্গ কালো থেকে বদলে সবুজ করা হয়েছিল।
ধূর্ত খলিফা মামুনুর রশিদ মুসলমানদের মধ্যে বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় আতঙ্কিত ছিল এবং এর ফলে আব্বাসিয়দের খিলাফত বৈধতা হারাতে পারে বলে তার আশঙ্কা বাড়ছিল। কারণ, নবী(সা.)- বংশের কাছে খিলাফত ফিরিয়ে দেয়ার শ্লোগান তুলে জনপ্রিয় গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে উমাইয়াদেরকে খিলাফতের ক্ষমতা থেকে উতখাত করা হয়েছিল। অথচ আব্বাসিয়রা নবী(সা.)- বংশের কাছে ক্ষমতা না দিয়ে নিজেরাই ক্ষমতা দখল করে।জনগণ আব্বাসিয়দের এই প্রতারণার কথা কখনও ভুলতে পারেনি।
এই প্রেক্ষাপটে খলিফা মামুন মদীনা থেকে হযরত ইমাম রেযা (আ.)-কে তার রাজধানী তথা সুদূর খোরাসানের মার্ভে আসতে বাধ্য করেন। মামুন ইমামের কাছে খেলাফত হস্তান্তর করতে চায় বলেও ঘোষণা করে। কিন্তু ইমামের প্রজ্ঞাপূর্ণ তাতক্ষণিক উত্তর মামুনের চক্রান্ত বানচাল করে দেয়। হযরত ইমাম রেযা (আ.) মামুনকে বললেন: “যদি খিলাফত সত্যিই তোমার অধিকার হয়ে থাকে এবং আল্লাহ তোমাকে তা আমানত হিসেবে দান করে থাকেন তাহলে তা অন্যের কাছে ত্যাগ করা তোমার উচিত হবে না; আর এই খিলাফত যদি তোমার না হয়ে থাকে তাহলে তা তুমি অন্যকে কিভাবে দান করবে যা তোমার নিজের নয়?”
কিন্তু মামুন দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ইমামের ওপর নানা পন্থায় চাপ দেয়া অব্যাহত রাখে এবং এমনকি গোপনে ইমামকে হত্যারও হুমকি দেয়। খিলাফতের পদ গ্রহণ না করলেও ইমাম যেন অন্ততঃ যুবরাজের পদ তথা পরবর্তী খলিফা হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন সে জন্য চাপ দিতে থাকে মামুন। ফলে মামুন(৩১) ইমামের(৫৩) চেয়ে ২২ বছরের ছোট হওয়া সত্ত্বেও শর্ত-সাপেক্ষে ওই প্রস্তাব মেনে নেন ইমাম রেযা (আ.)। যেমন, একটি শর্ত ছিল এটা যে, রাজকীয় পদে কারো নিয়োগ বা পদচ্যুতির কাজে ইমামের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। ইমামের এ ধরনের সতর্ক পদক্ষেপের ফলে মামুনের অসত উদ্দেশ্যগুলো বানচাল হয়ে যায় এবং জনগণের মধ্যে ইমামের প্রভাব দিনকে দিন বাড়তেই থাকে। ফলে দুই বছর পর ২০৩ হিজরিতে মামুন খাদ্যে বিষ প্রয়োগ করে এই মহান ইমামকে শহীদ করে এবং তার রাজধানী মার্ভ থেকে বাগদাদে ফিরিয়ে আনে।

সূত্র : রেডিও তেহরান, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.