বাস্তব ও কোরান হাদিসের দৃষ্টিতে সাহাবীগনঃ

বাস্তব ও কোরান হাদিসের দৃষ্টিতে সাহাবীগণঃ-১
জাগ্রত বিবেক ও আলোকিত অন্তরের অধিকারীদের উদ্দেশ্য করে আজকের এই নোট। আশা করি সকলে মনের উগ্রতাকে দূরে রেখে বাস্তবভিত্তিক স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে সত্য উপলব্দি করবেন। যদিও বিষয়টি স্পর্ষকাতর তারপরেও এটা নিয়ে আমাদের অধ্যায়ন করা দরকার। সকলেই পবিত্র আল কোরানের উক্ত আয়াতটি একবার তিলাওয়াত করে নেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বে সত্যকে তোমরা গোপন করো না। (বাকারা-৪২)”।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, হুজুর পাক (সাঃ) এর বিশিষ্ট সাহাবীগণ ছিলেন খুবই সম্মানিত ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহর ওহী ও আয়াতসমূহ পয়গম্বর (সাঃ) এর পবিত্র মুখ থেকে শ্রবণ করতেন। নবীজীর (সাঃ) মুজিযাগুলো তাঁরা অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ করতেন এবং নবীজীর (সাঃ) মূল্যবান কথার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করতেন। তাঁর উত্তম আমল ও আখলাক সাহাবা কেরামের উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। একারণেই নবীজীর (সাঃ) সান্নিধ্যে এমন প্রসিদ্ধ ও বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন যাঁদের কারণে মুসলিমজাহান গর্ববোধ করে। কিন’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন রকম ব্যতিক্রম ছাড়াই কী সকল সাহাবীগণ মুমিন, নেক্‌কার, সত্যবাদী, সঠিক ও ন্যায়বান ছিলেন নাকি তাদের মধ্যে এর বিপরীতধর্মী ব্যক্তিরাও ছিলেন?
(১) দু’টি বিপরীতধর্মী আক্বিদাঃ **************************** সাহাবীদের সম্পর্কে দু’টি ভিন্নমত প্রচলিত আছে। প্রথম আক্বীদা বা বিশ্বাস হল যে, সকল সাহাবী কোন ব্যতিক্রম ছাড়াই পবিত্রতার আলোয় আলোকিত আর সকলেই নেক্‌কার, ন্যায়বান, পরহেজগার ও সত্যবাদী ছিলেন। এ কারণে এদের মধ্যে যিনিই নবীজীর (সাঃ) হাদীস বর্ণনা করবেন তা সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য হবে। আর এ ক্ষেত্রে সামান্যতম আপত্তিও উত্থাপন করা যাবে না। তাদের দ্বারা কোন ভুল কাজ সংঘটিত হয়ে থাকলে তার অন্তর্নিহিত কোন কারণ আছে ধরে নিতে হবে। আহলে সুন্নাতের অধিকাংশ দল একই বিশ্বাস পোষণ করেন।
দ্বিতীয় আকিদা বা বিশ্বাস হল, যদিও নবীজীর (সাঃ) সান্নিধ্যে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, আত্মত্যাগী ও তাকওয়াসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন তথাপি মোনাফেক ও ন্যায়-নীতিহীন ব্যক্তিরাও সেখানে ছিলেন; যাদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও নবী করিম (সাঃ) অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
অন্যান্য ক্ষেত্রে ভাল ও মন্দ নিরূপণের যে সকল মানদণ্ড নির্দ্ধারণ করা হয়ে থাকে আমরা এখানেও সেই মানদণ্ড ব্যবহার করব।
তা না হলে আমরা ঐ আয়াতের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাব যেখানে আল্লাহ বলেছেন, “আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ”। (সূরা আরাফ-১৭৯)
যেহেতু তাঁরা নবীজী (সাঃ) এর সাহাবী ছিলেন সে কারণে তাঁদের সম্পর্কে আমাদের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি এটাই হবে যে, তাঁরা হচ্ছেন পবিত্র ও ভাল মানুষ, তা সত্ত্বেও আমরা সত্যতাকে এড়িয়ে যাব না এবং ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যের পরিপন্থী আচরণ সম্পর্কে নির্লিপ্তও থাকব না। কেননা, এ ধরনের নেতিবাচক কর্মসমূহ ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের উপর কঠোর আঘাত হানে এবং ইসলামের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে মোনাফিকদের প্রবেশের পথ সৃষ্টি করে।
শিয়া মাযহাব ও আহলে সুন্নাতের আলোকিত চিন্তাধারার একদল আলেম এ আক্বীদার পক্ষে তাদের রায় দিয়েছেন।
(২) পবিত্রতা সম্পর্কে উগ্র মনোভাবঃ ********************************* সকল সাহাবা কেরামকে পবিত্র মনে করেন এ মন দৃষ্টিভঙ্গী পোষণকারী একটি দল এমন উগ্র মনোভাব দেখান যে, যেকোন ব্যক্তি সাহাবা কেরামের সমালোচনা করলে তাকে ফাসেক; আবার কখনো কাফের, নাস্তিক বলে গণ্য করেন এবং তার হত্যাকে বৈধ বা হালাল মনে করেন। এ কথাগুলোর স্বপক্ষে আবু যর আর রাজি প্রণীত গ্রন্থ “আল আসাবাহ”তে এভাবে উল্লেখ আছে যে, “তোমরা যদি দেখ যে, কোন ব্যক্তি পয়গম্বর (সাঃ) এর কোন সাহাবীর সমালোচনা করছে তাহলে জানবে যে ঐ ব্যক্তি পথভ্রষ্ট কাফের। এ ফতোয়া-এ কারণে যে, যেহেতু আল্লাহর রাসুল (সাঃ) সত্য এবং কোরআন সত্য এবং যা কিছু পয়গম্বর (সাঃ) এর উপরে নাযিল হয়েছে তা সত্য এবং এসব কিছুকে সাহাবা কেরাম আমাদের নিকটে পৌঁছে দিয়েছেন আর এর বিরোধিতাকারীরা চায় আমাদের সাক্ষ্য প্রমাণকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে যাতে কোরআন ও সুন্নাহ হাত থেকে বেরিয়ে যায়। (আল-আসাবাহ, খঃ ১, পৃঃ ১৭)
আব্দুল্লাহ মুসলী স্বীয় “হাত্তা লা তাখাদ্দা” গ্রনে’ উল্লেখ করেছেন যে, “সাহাবা কেরামগণ এমনই একটি দল যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা তার নবীর (সাঃ) সঙ্গী এবং দ্বীন ও শরীয়তের সার্বিক ব্যবস’াপনার জন্য বেছে নিয়েছেন এবং তাঁদেরকে নবীকরিম (সাঃ) এর উজির হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাঁদের প্রতি ভালবাসাকে দ্বীন ও ঈমান এবং তাঁদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষপোষণকে কুফরী ও নেফাক বলে গণ্য করেছেন! এবং তাঁদের সকলকে বন্ধু ভাবা উম্মতের জন্য ওয়াজিব এবং সর্বদা তাঁদের গুণকীর্তন ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা এবং তাঁদের পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ ইত্যাদি সম্পর্কে নীরবতা পালন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (হাত্তালা তাখাদ্দা, পৃঃ ২)
উপরোক্ত উক্তিসমূহ পবিত্র কোরআন ও হাদীসের পরিপন্থী তা অতিসত্বর স্পষ্ট হবে।
(৩) অর্থহীন কিছু প্রশ্নঃ ******************** বুদ্ধিমান ও বিবেকবান প্রত্যেক ব্যক্তি যিনি প্রতিটি কথা অকাট্য দলিল প্রমাণ ছাড়া অন্ধভাবে গ্রহণ করেন না এবং নিজেকেই এ প্রশ্নগুলো করে থাকেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে হুজুর পাক (সাঃ) এর স্ত্রীগণের সম্পর্কে এরশাদ করছেন ঃ অর্থাৎ, “হে নবী পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ”। (৩৩ঃ ৩০)
আমরা সাহাবা শব্দের যে ব্যাখ্যাই দিই না কেন, আর যে অর্থই করি না কেন, সন্দেহাতীতভাবে নবী (সাঃ) এর স্ত্রীগণ সাহাবীগণের মধ্যে এক অত্যুজ্জ্বল সাক্ষ্য বা প্রমাণস্বরূপ। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে যে, না কেবল এটাই যে, তাদের (স্ত্রীগণের) গোনাহর ছাড় দেয়া হবে না বরং সে গোনাহর শাস্তি দ্বিগুণ হবে।
এখন আমরা পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের উপর বিশ্বাস রাখাব না কি তাদের উপর যারা কোন প্রকার সমালোচনা করা যাবে না এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন?
আবার পবিত্র কোরআনে হযরত নুহ (আঃ) এর পুত্রের ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে ঃ অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই সে দুরাচার……….”। (১১ঃ ৪৬)
এবং হযরত নুহ (আঃ) কে এ মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয় যেন পুত্রের জন্য শাফায়াত না করেন!
একজন নবীর পুত্র গুরুত্বপূর্ণ না কি তাঁর সঙ্গী-সাথী?
হযরত নুহ (আঃ) এবং হযরত লুত (আঃ) এর স্ত্রীগণের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এভাবে এরশাদ হচ্ছে ঃ অর্থাৎ, “আল্লাহ তায়ালা নুহ পত্নী ও লুত পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। তারা ছিল আমার দুই ধর্মপরায়ণ বান্দার গৃহে। অতঃপর তারা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। ফলে নুহ ও লুত তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার কবল থেকে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হল ঃ জাহান্নামীদের সাথে জাহান্নামে চলে যাও।” (৬৬ঃ ১০)
এ আয়াতসমূহ কী স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেনা যে, একজন মানুষের ভাল-মন্দের মানদণ্ড হচ্ছে তাঁর ঈমান ও আমল। এমনকি নবীর স্ত্রী, পুত্রও যদি মন্দ আমলের অধিকারী হয় তাহলেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি নেই। তাহলে এমন ধারণা কি সঠিক হবে যে, অমুক ব্যক্তি যেহেতু কিছুকাল নবী (সাঃ) এর সাহাবী ছিলেন সুতরাং তার প্রতি মহব্বত ভালবাসা দ্বীন ও ঈমান এবং তার বিরোধিতা কুফর ও নেফাক বলে বিবেচিত হবে? চাই ঐ সাহাবী পরবর্তীতে মোনাফিকদের সারিতে প্রবেশ করলেও এবং নবী করিম (সাঃ) এর মনঃকষ্টের কারণ হলেও এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাথে খেয়ানত করলেও তার বিরোধিতা করা যাবে না; জ্ঞান ও বিবেক কি এ কথাগুলো গ্রহণ করবে? এখন আমরা পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের উপর বিশ্বাস রাখব না কি তাদের উপর যারা কোন প্রকার সমালোচনা করা যাবে না এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন?
এ আয়াতসমূহ কী স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছেনা যে, একজন মানুষের ভাল-মন্দের মানদণ্ড হচ্ছে তাঁর ঈমান ও আমল। এমনকি নবীর স্ত্রী, পুত্রও যদি মন্দ আমলের অধিকারী হয় তাহলেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি নেই। তাহলে এমন ধারণা কি সঠিক হবে যে, অমুক ব্যক্তি যেহেতু কিছুকাল নবী (সাঃ) এর সাহাবী ছিলেন সুতরাং তার প্রতি মহব্বত ভালবাসা দ্বীন ও ঈমান এবং তার বিরোধিতা কুফর ও নেফাক বলে বিবেচিত হবে? চাই ঐ সাহাবী পরবর্তীতে মোনাফিকদের সারিতে প্রবেশ করলেও এবং নবী করিম (সাঃ) এর মনঃকষ্টের কারণ হলেও এবং নবী করিম (সাঃ) বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাথে খেয়ানত করলেও তার বিরোধীতা করা যাবে না জ্ঞান ও বিবেক কি এ কথাগুলোকে গ্রহন করবে? যদি কেউ বলেন কি এ কথাগুলোকে গ্রহণ করবে? যদি কেউ বলেন যে, তালহা ও যুবাইর ইসলামের প্রাথমিক যুগে ভাল মানুষ ছিলেন কিন্তু যখন রাষ্ট্র ক্ষমতার খায়েশ তার উপর চেপে বসলো তখন তিনি রাসুলের (সাঃ) স্ত্রীকে (হযরত আয়েশা) নিজের সাথে নিলেন এবং হযরত আলী (আঃ) এর সাথে তার কৃত বয়াত ভঙ্গ করলেন। যদিও প্রায় সকল মুসলমান হযরত আলী (আঃ) এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিল। এরপর তারা উষ্ট্র যুদ্ধের আগুনকে প্রজ্জ্বলিত করলেন আর এভাবে সতের হাজার মুসলমান ঐ যুদ্ধে নিহিত হন। সুতরাং এরা সঠিক পথ থেকে বিমুখিতা অবলম্বন করেছিলেন এবং এত অধিক পরিমাণ মানুষের রক্তের দায় তাদের উপরই বর্তাবে এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে।
একথাগুলো কি সত্যের অপলাপ না কি সত্যের পরিপন্থী?
অথবা কেউ যদি বলে, যেহেতু মুয়াবিয়া হযরত আলী (আঃ) এর বায়াতের বিরোধিতা করেছিল আর যে খেলাফতকে সকল মুসলমান গ্রহণ করে নিয়েছিল সে তা অস্বীকার করে সিফ্‌ফীনের যুদ্ধের সূচনা করল। যে যুদ্ধে হাজার হাজার মুসলমান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সুতরাং মুয়াবিয়া একজন অত্যাচারী ব্যক্তি ছিল এ কথা বলা কি অন্যায় হবে?
ইতিহাসের এই তিক্ত সত্যতা থেকে কি দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া যায়? অথবা ঐ ভুল বর্ণনার কারণে যা কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই গ্রহণ করবে না; আব্দুল্লাহ মুসলী কর্তৃক বর্ণিত এমন লোকের প্রতি কি ভালবাসা দ্বীন ও ঈমান এবং তাদের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ, কুফর ও নেফাক বলে বিবেচিত হবে?
এটাই কি দায়িত্ব যে, হাজার হাজার মুসলমানের রক্তে কলঙ্কিত ঐ সকল অপকর্মের সামনে নীরব নিঃশ্চুপ থাকি? কোন্‌ জ্ঞান বুদ্ধিতে এ নির্দেশ মেনে নেয়া যায়?
পবিত্র কোরআনের এ আয়াত থেকে কি চোখ ঘুরিয়ে নেব, যেমন এরশাদ হচ্ছে যে, নবী করিম (সাঃ) এর চতুর্পার্শ্বে সমবেত হওয়া মানুষ জনের মধ্যে মোনাফেকরাও ছিল?
এরশাদ হচ্ছে ঃ অর্থাৎ, “আর কিছু কিছু তোমার আশপাশের মুনাফেক এবং কিছু লোক মদীনাবাসী কঠোর মুনাফেকীতে অনঢ়। তুমি তাদের জান না, আমি তাদের জানি। আমি তাদেরকে আযাব দান করব দু’বার, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে মহান আযাবের দিকে”। (৯ঃ ১০১)
আপনি কি আশা করেন, এ ধরনের যুক্তি পৃথিবীর জ্ঞানী মানুষরা গ্রহণ করবে?
(৪) সাহাবী করা? *************** এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, “সাহাবা’ শব্দটি। সাহাবা, যাদের সম্পর্কে পবিত্রতা ও শুচিতার কথা বলা হয়; কিন্তু প্রশ্ন হল সাহাবা বলতে কাদেরকে বুঝায়? এ সম্পর্কে আহলে সুন্নাতের ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে প্রশংসা করা হয়েছে।
(ক) কেউ কেউ এ বিষয়টিকে অনেক ব্যাপক রূপ দিয়েছেন। তারা বলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে যিনিই হুজুর পাক (সাঃ) এর সাক্ষাৎলাভ করেছেন তিনিই তাঁর সাহাবা হিসেবে আখ্যায়িত হবেন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিখ্যাত আলেম হযরত আহমেদ বিন হাম্বলও সাহাবী শব্দকে ব্যাপকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর সাহাবী তিনি যিনি রাসুল (সাঃ) এর সংশ্রব ও সাহচর্য লাভ করেছেন। হোক তা একমাস বা একদিন অথবা এক ঘন্টার জন্য। বরং যদি কেউ সামান্যতম সময়ের জন্য হুজুর পাক (সাঃ) কে দর্শনও করে থাকে তাহলেও সে সাহাবী হিসেবে গণ্য হবে”।
(খ) কোন কোন ওলামা সাহাবীর পরিচয় সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থাপন করেছেন। যেমন, কাজী আবু বকর মোহাম্মাদ ইবনে তৈয়ব উল্লেখ করেছেন যে, “যদিও সাহাবীর আভিধানিক অর্থ ব্যাপক তথাপি সাহাবী বলতে তাঁদেরকে বুঝায় যারা দীর্ঘ দিন হুজুর পাক (সাঃ) এর সাহচর্য লাভ করেছেন। যারা সামান্য সময়ের জন্য হুজুর (সাঃ) এর সাথে থেকেছেন অথবা কয়েক পা হেঁটেছেন কিংবা দু’একটি হাদীস নবীজীর (সাঃ) পবিত্র মুখ থেকে শুনেছেন তারা সাহাবীর মধ্যে গণ্য নন।”
(গ) কোন কোন ওলামা সাহাবীর পরিচয়ের সীমা আরও সীমিত করেছেন। যেমন, সাঈদ বিন আল মাসাইয়্যাব লেখেন যে, “নবীজীর (সাঃ) সাহাবী তাঁদেরকেই বলা হবে যারা অন্ততঃপক্ষে এক অথবা দুই বছর হুজুর (সাঃ) এর সাথে থেকেছেন এবং দু’একটি যুদ্ধে হুজুর (সাঃ) এর সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। (তাফসীরে কারতাবী, খঃ ৮, পৃঃ ২৩৭)
সাহাবীর সংজ্ঞা ও পরিচয় সম্পর্কে আরো অধিক বর্ণনা থাকলেও তালিকা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশংকায় এখানে উল্লেখ করা হলো না। যদিও আমাদের আলোচ্য বাহাসের ক্ষেত্রে এ পরিচয়সমূহ কোন পার্থক্য নিরূপন করে না।
এখন আপনাদের কাছে স্পষ্ট হবে যে, রাসুল পাক (সাঃ) এর সীরাতের বিরোধিতাকারী অধিকাংশ ব্যক্তি তারাই ছিলেন যারা দীর্ঘকাল হুজুর (সাঃ) এর সাথে অতিবাহিত করেছিলেন। সাহাবীদের প্রকারভেদ যা কোরানে বর্ণিত হয়েছে এবং কতিপয় সাহাবীর ত্রুটি সম্পর্কে যা কোরান সিহাহ্ সিত্তাহ্তে বিশেষভাবে বর্ণনা হয়েছে।
(৫) ‘পবিত্রতা’ সম্পর্কিত আক্বীদার প্রকৃত কারণ ও ভিত্তিঃ ************* সাহাবীগণের সম্পর্কে এত বেশী পবিত্র হওয়ার আক্বীদা পোষণ করা অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে নিষ্পাপতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অথচ এ বিষয়টির উল্লেখ না পবিত্র কোরআনে আছে আর না-ই কোন হাদীস গ্রন্থে। বরং কোরআন, সুন্নাহ ও ইতিহাসে এর বিপরীত চিত্র আমরা দেখতে পাই। এমন কি, বলা হয়ে থাকে প্রথম শতাব্দীতে এ ধরনের কোন আক্বীদা-বিশ্বাসের অস্তিত্ব ছিল না। এখন আমাদের দেখতে হবে যে, পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এ ধরনের বিষয় কেন এবং কোন দলীলের ভিত্তিতে সংযোজন করা হয়েছে?
আমার ধারণা মতে এ আক্বীদা নির্বাচনের পেছনে কিছু কারণ আছে। **************** (ক) পক্ষপাতহীনভাবে বলতে গেলে বলতে হয় একটি কারণ হলো যেটি পূর্বের বাহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোন কোন ব্যক্তি ধারণা পোষণ করে থাকেন যে যদি সাহাবা কেরামগণের পবিত্রতা বিনষ্ট হয় তাহলে তাদের ও পয়গম্বর (সাঃ) এর মাধ্যমে যে নৈকট্যের বৃত্ত তা ভেঙ্গে পড়বে। কেননা পবিত্র কোরআন ও পয়গম্বর (সাঃ) এর সুন্নাত তাদের মধ্যে আমাদের মাঝে পৌছেছে। কিন্তু এ কথার জবাব খুবই স্পষ্ট, কেননা আল্লাহ ক্ষমা করুন সকল মুসলমান সাহাবীগণকে ভুল ও মিথ্যাবাদী বলেন না কারণ তাদের মধ্যে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সংখ্যা অনেক ছিল। ঐ বিশ্বস্ত সাহাবারই পয়গাম্বর (সাঃ) ও আমাদের মাঝে নৈকট্যের বৃত্ত হতে পারেন।
মজার ব্যাপার হল পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও একই সমস্যা দেখা যায়। কেননা, আজকে আমরা কয়েকটি মাধ্যমের সাহায্যে নিজেদেরকে পয়গম্বর (সাঃ) এর সাথে সম্পৃক্ত করে থাকি। কিন্তু কেউ দাবী করেনি যে, এ সকল মাধ্যমসমূহ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য এবং প্রত্যেক শতাব্দীর মানুষ পবিত্র ছিলেন আর এমন যদি না হয় তাহলে আমাদের ধর্ম নড়বড়ে হয়ে যাবে। বরং সবাই এ কথাই বলেন যে, ন্যায়বান ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের নিকট থেকে হাদীস গ্রহণ করা উচিৎ। ইলমে রেজাল (ব্যক্তি মানুষ ও বংশধারা সম্পর্কিত শাস্ত্র) সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রন্থাবলী প্রণয়ন করার উদ্দেশ্য তো এটাই যে নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্যের মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করা এবং নির্ভরযোগ্যকে অর্নিরযোগ্যের উপর প্রাধান্য দেয়া। তাহলে সাহাবা কেরাম সম্পর্কেও আমরা একই পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারি, যে পদ্ধতি আমরা সাহাবা কেরামের পরবর্তীগণের ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছি। এতে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়।
(খ) কেউ কেউ এ ধারণা পোষণ করেন যে, সাহাবা কেরামের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা এবং তাদের সমালোচনা করলে স্বয়ং পয়গম্বর (সাঃ) এর সম্মান ও মর্যাদা হ্রাস পায়। এ কারণে সাহাবা কেরামের সমালোচনা জায়েজ নয়।
যারা এ দলিলের সাহায্য নিয়ে থাকেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, পবিত্র কোরআনে কী হুজুর পাক (সাঃ) এর চারপাশে সংগঠিত হওয়া মুনাফিকদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড আকারে আক্রমণ করা হয়নি? হুজুর পাক (সাঃ) এর বিশুদ্ধ ও সত্যবাদী সাহাবীদের মধ্যে মুনাফিকদের উপস্থিতির কারণে তাঁর (সাঃ) মর্যাদায় কি কোন ঘাটতি হয়েছে? কখনই না! আসল বিষয় হচ্ছে সব সময় এবং সকল যুগে এমনকি সকল নবীদের (আঃ) যুগেও ভাল ও মন্দ ব্যক্তিদের উপসি’তি লক্ষণীয় এবং এ কারণে আম্বীয়া কেরামের মান মর্যাদার উপর কোন প্রভাব পড়তো না।
(গ) সাহাবা কেরামের আমলের সমালোচনা যদি শুরু হয় তাহলে কোন কোন খোলাফা-এ-রাশেদীন এর ব্যক্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এর জন্য তাঁদের মান মর্যাদা রক্ষার্থে তাঁদের পবিত্রতা সম্পর্কে তাগিদ দেয়া উচিৎ যাতে কোন ব্যক্তি যেমন, হযরত উসমান (রাঃ) এর ঐ সকল কর্মকান্ড সম্পর্কে কোন প্রকার আপত্তি না ওঠে। যেমন বায়তুল মাল সম্পর্কিত বিষয় এবং ঐ সকল ঘটনাবলী যেগুলো তাঁর শাসনামলে ঘটেছিল এবং কেন এমন ঘটেছিল কেউ যেন এ বিষয়ে প্রশ্ন না করে। এমনকি পবিত্রতার বৃত্তের মধ্যে মুয়াবিয়া ও তার কর্মকান্ডও অন্তর্ভূক্ত। যেমন তিনি রাসুলের (সাঃ) খলীফা হযরত আলী (আঃ) এর বিরোধীতা করলেন এবং তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন এবং মুসলমানদের রক্তে তার হাত রঞ্জিত হল। এ ধরনের কর্মকান্ডের বিপক্ষেও কোন কথা বলা যাবে না এবং অস্ত্রের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে সমালোচনার বাক্যবান থেকে রক্ষা করা যায়। অবশ্য এ থেকে জানা যায় যে, পবিত্রতা সংশ্লিষ্ট এ ধরনের বিষয়সমূহের ভিত্তি প্রারম্ভিক শতাব্দীর রাজনীতিকরা স্থাপন করেছেন। যেভাবে তারা “উলীল আমর” শব্দের অর্থ “সমকালীন শাসক” করেছেন যাতে বনি উমাইয়া ও বনি আব্বাস গোত্রের অত্যাচারী শাসকদের আনুগত্য প্রমাণ করা যায়। আমার ধারণা হলো, তাদের এ ধরনের বক্তব্যের উদ্দেশ্য সকল সাহাবাকে রক্ষা করা ছিল না বরং তাদের পছন্দনীয় কিছু ব্যক্তিকে রক্ষা করাই ছিল আসল উদ্দেশ্য।
(ঘ) কোন কোন ব্যক্তি এ আক্বীদা পোষণ করেন যে, সাহাবীগণের পবিত্রতা সম্পর্কে আক্বীদা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক। কেননা কোরআনের কোন কোন আয়াতে এবং বেশকিছু হাদীসে এ বিষয়টির প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। কিন’ আমরা যখন উক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহের বিশ্লেষণ করি তাহলে বুঝতে পারব যে ঐ আয়াত ও হাদীস দ্বারা তারা যে বিষয় প্রমাণ করতে চাইছেন তা সেখানে অনুপসি’ত। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে আয়াতটি দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তা নিম্নরূপঃ
অর্থাৎ, “আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুস্মরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কাননকুঞ্ছ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রশ্রবণসমূহ। যেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা।” (সুরা আত তাওবাহ ঃ ১০০)
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনেক প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কোন সাহাবা ও হুজুর পাক (সাঃ) এর হাদীস উল্লেখ করেছেন যার বক্তব্য হচ্ছে নিম্নরূপঃ
“হুজুর পাক (সাঃ) এর সকল সাহাবীগণ জান্নাতী তারা ন্যায় অথবা মন্দকর্মশীল হলেও”। উক্ত হাদীসে উপরোল্লিখিত আয়াতকে সনদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। (তাফসীরে কাবীর, ফাখরুদ্দীন রাযী ও তাফসীর আল মিনার)
মজার ব্যাপার এই যে, উপরোল্লিখিত আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাবেয়ীনগণ সেই ক্ষেত্রে নাজাতপ্রাপ্ত হবেন যখন তারা নেককর্মের ক্ষেত্রে সাহাবাদের অনুস্মরণ করবেন (নাকি মন্দ কর্মের) যার অর্থ হচ্ছে তাঁরা কি গোনাহর ক্ষেত্রে স্বাধীন? অর্থাৎ, গোনাহ করলেও কি তাঁরা জান্নাতের হকদার হবেন?
যে নবীর (সাঃ) আগমন মানুষের হেদায়েত ও সংশোধনের জন্য এটা কি সম্ভব যে, তিনি তার সঙ্গী সাথীদেরকে এর থেকে বাইরে রাখবেন এবং তাদের গোনাহকে উপেক্ষা করবেন? অথচ পবিত্র কোরআন রাসুলের (সাঃ) স্ত্রীদের সম্পর্কে এরশাদ করছে যে, সর্বাধিক নিকটবর্তী সাহাবী (স্ত্রীগণের মধ্যে) ছিলেন। তারা যদি তারা অশ্লীল কাজ করেন তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে। (সূরা আহযাবঃ ৩০)
এখন মনোযোগ আকর্ষণকারী বিষয় হচ্ছে যে, উক্ত আয়াতের যদি কোন ব্যাখ্যা কিংবা অর্থগত গোঁজামিল হলেও সূরা ফাত্‌হর ২৯ নং আয়াত তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। কেননা উক্ত আয়াতে হুজুর পাক (সাঃ) এর সত্য ও ন্যায়বান সাহাবীদের গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে।
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাঁদের মুখমন্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন……….।” (সূরা আল ফাত্‌হঃ ২৯)
যারা জামাল (উষ্ট্রের যুদ্ধ) ও সিফফিনের মত যুদ্ধের সূচনাকারী এবং যুগের বৈধ ইমামের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিলেন এবং হাজারো মুসলমানদের রক্তে যাদের হাত রঞ্জিত তারা কি উক্ত গুণাবলীর স্বাক্ষর বহন করেন? তারা কি পরস্পর সহানুভূতিশীল? তাদের আমলগত ক্রিয়াসমূহ কি কাফেরদের বিরুদ্ধে ছিল না মুসলমানদের বিরুদ্ধে? আল্লাহ তায়ালা উক্ত আয়াতের ধারাবাহিকতায় আরো একটি বাক্য সংযোজন করে এরশাদ করছেন, “আল্লাহ তায়ালা (ঐ সহচরগণের মধ্য থেকে) যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন।” (সূরা আল ফাত্‌হঃ ২৯)
অতএব, এখানে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ক্ষমা এবং মহাপুরস্কারের ওয়াদা কেবলমাত্র তাদের জন্য যারা ঈমানদার এবং সৎকর্মশীল। যারা জামালের যুদ্ধে মুসলমানদেরকে হত্যা করেছে এবং এ যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত ও উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হযরত উসমানের খেলাফতকালে যারা বায়তুল মাল তছরুপ করেছে তারা কি সৎকর্মশীলদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবেন? এখানে যথোপযুক্ত মনোযোগ আকৃষ্ট করার বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর উলুল আযম পয়গম্বরগণকর্তৃক ছোট্ট একটি নির্দেশ পরিত্যাগ করার কারণে (তার্কে আওলা) পাকড়াও করেছেন। হযরত আদম (আঃ) একটি তার্‌কে আওলার জন্য জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নীত হয়েছিলেন। একটি তার্‌কে আওলার কারণে হযরত ইউনুস (আঃ) কে মাছের পেটে অন্ধকার গহ্বরে অতিবাহিত করতে হয়েছিল। হযরত নুহ (আঃ) স্বীয় পুত্রের সুপারিশ করলে আল্লাহ ভর্সনা করেন। তাহলে আমাদের এক্ষেত্রে বিশ্বাস করার কি কোন সুযোগ আছে যে, পয়গম্বর (সাঃ) এর সহচরগণ এ সকল আইনের উর্দ্ধে ?
(৬) ব্যতিক্রম ছাড়াই সকল সাহাবা কী ন্যায়বান ছিলেন ? *********** যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধিকাংশ ভাইয়েরা বিশ্বাস করেন যে, সকল সাহাবা যাঁরা হুজুর (সাঃ) এর যুগে বাস করতেন অথবা কিছু সময়ের জন্য তাঁর (সাঃ) সঙ্গলাভ করেছিলেন তাঁরা সকলই ন্যায়বান ছিলেন এবং পবিত্র কোরআনও সাক্ষ্য দেয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ঐ সকল ভাইয়েরা সাহাবাগণের সপক্ষে যে আয়াতগুলো বর্ণিত হয়েছে তা গ্রহণ করেছেন কিন্তু বিপরীতধর্মী আয়াতগুলোকে যেখানে ব্যতিক্রম বর্ণনা এসেছে তা উপেক্ষা করেছেন।
আমি এখানে বিনীতভাবে উল্লেখ করব যে, এটা কেমন ন্যায়পরায়ণতা যার বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন বার বার সাক্ষ্য দিচ্ছে? সুরা আলে ইমরানের ১৫৫ নং আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে যে, অর্থাৎ, “তোমাদের যে দুটি দল লড়াইয়ের দিনে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল শয়তান তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল তাদেরই পাপের দরুন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করেছেন কেননা তিনি উক্ত আয়াতে ঐ সকল ক্ষমাকারী” লোকদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যারা ওহুদের যুদ্ধের দিন পলায়ন করেছিলেন এবং দুশমনদের মোকাবিলায় পয়গম্বর (সাঃ) কে নিঃসঙ্গ রেখে যুদ্ধক্ষেত্রে ত্যাগ করেছিলেন।
উক্ত আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঐ দিন একটি দল যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেছিল এবং ইতিহাসে উক্ত পলায়নকারী দলের সদস্যের সংখ্যা অধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে চিত্তাকর্ষক ব্যাপার হল পবিত্র কোরআন তাদেরকে শয়তান বিভ্রান্ত করেছিল বলে উল্লেখ করেছে এবং তা তাদের পাপের কারণেই যে পাপে তারা পূর্বেই লিপ্ত ছিলেন। অতএব, জানা গেল যে, অতীতের পাপ একটি বড় পাপের (যুদ্ধ থেকে পলায়নের) কারণ হয়েছিল। যদিও আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহর এ ক্ষমা ঘোষণা হুজুর পাক (সাঃ) এর কারণেই ঘোষিত হয়েছিল। এর অর্থ এই নয় যে তারা আদেল বা ন্যায়বান ছিলেন এবং তাদের দ্বারা কোন পাপ কাজ সংঘটিত হয়নি। বরং পবিত্র কোরআন স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছে তারা অনেকবারই গোনাহে লিপ্ত হয়েছিলেন।
এটা কেমন আদালত বা ন্যায়পরায়নতা যে, পবিত্র কোরআন সুরা হুজরাতের ৬ নং আয়াতে কোন কোন ব্যক্তিকে ফাসেক বলে সম্বোধন করেছে।
এরশাদ হচ্ছেঃ অর্থাৎ, “মুমিনগণ, যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।”
কোরআনের মুফাসসিরগণের মধ্যে জোরালো ও প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে যে, এ আয়াতটি ওলীদ বিন ওকাবা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। নবী করিম (সাঃ) একটি দলের সাথে তাকে যাকাত আদায়ের জন্য বনি আল মুসতালাক গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন। ওলীদ সেখান থেকে ফিরে এসে বললো, ঐ গোত্রের লোকেরা যাকাত প্রদান করবে না এবং ইসলামের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে। মুসলমানদের একটি অংশ তার কথা বিশ্বাস করল এবং উক্ত গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার তাৎক্ষণিক ঘোষণা দিল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুরা হুজরাতের উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হয় এবং মুসলমানদেরকে এ মর্মে সাবধান করে দেয়া হয় যে, যদি কোন ফাসেক ব্যক্তি কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে। এমন না হয় যে, মিথ্যা সংবাদের কারণে তোমরা কোন সমপ্রদায়ের ক্ষতি সাধনে প্রবৃত্ত হও এবং পরে অনুশোচনা কর।
অনুসন্ধান চালানোর পর জানা যায় যে, বনি আল মুসতালাক গোত্রের লোকেরা মুমিন ছিলেন এবং তারা ওলিদের অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে বাইরে অপেক্ষমান ছিলেন এবং ইসলামের বিপক্ষে তারা অবস্থান নেননি। প্রকৃত ঘটনা হল, ওলিদ তাদের সাথে ইসলাম গ্রহণের পূর্ব থেকে শত্রুতা পোষণ করতো। এরই অজুহাতে সে ফিরে আসে এবং মিথ্যা সংবাদ হুজুর পাক (সাঃ)কে দেয়। ওলিদ হুজুর পাক (সাঃ) এর সাহাবী ছিল অর্থাৎ সে তাঁদের অন্তর্ভূক্ত ছিল যাঁরা পয়গম্বর (সাঃ) এর যুগে বাস করতেন এবং তাঁকে (সাঃ) স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং খেদমত করেছেন। অথচ পবিত্র কোরআন তাকে ফাসেক আখ্যায়িত করেছে। এখন প্রশ্ন হল এ আয়াতটি “সকল সাহাবী ন্যায়পরায়ন ছিলেন” এ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কী সামঞ্চস্যপূর্ণ? এ আবার কেমন ন্যায়পরায়নতা যে কোন কোন সাহাবী যাকাত বিতরণের সময় হুজুর পাক (সাঃ) এর সমালোচনা করেন? পবিত্র কোরআন তাদের আপত্তি ও সমালোচনাকে সুরা তাওবাহ’র ৫৮ নং আয়াতে উল্লেখ করেছে। ইরশাদ হচ্ছে, অর্থাৎ, “তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা সাদকা বন্টনে আপনাকে দোষারোপ করে। এর থেকে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয় না পেলে বিক্ষুব্ধ হয়”।
এ ধরনের ব্যক্তিকে কী ন্যায়পরায়ন বলা যাবে? এটা কেমন ন্যায়পরায়নতা যে, সুরা আহযাবের ১২ ও ১৩ নং আয়াতে আহযাব যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে এরশাদ হচ্ছে, “এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ ও রাসুলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ নয় এবং যখন তাদের একদল বলেছিল হে ইয়াসরেববাসী, এটা টিকবার মত জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চল। তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল আমাদের নাড়ী ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা”।
তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল বটে কিন্তু হুজুর পাক (সাঃ) এর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনেছিল এবং অপবাদ দিয়েছিল। তারা বলেছিল যে, আল্লাহ এবং তার রাসুল আমাদেরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করত যে, যুদ্ধে পয়গম্বর (সাঃ) পরাজিত হবেন এবং ইসলাম টিকবে না।
অথবা ঐ সকল বর্ণনা মতে যা শিয়া-সুন্নী উভয় সুত্র থেকে বর্ণিত হয়েছে। আমরা জানতে পারি যে, খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন করার সময় একটি প্রস্তর খন্ড পাওয়া যায় যেটি হুজুর (সাঃ) ভেঙ্গে ফেলেন এবং মুসলমানদেরকে সিরিয়া, ইরান ও ইয়েমেন বিজয়ের সুসংবাদ ও প্রতিশ্রুতি দিলেন। এতে একটি দল হুজুর (সাঃ) কে উপহাস করেছিল।
তারা কি রাসুল (সাঃ) এর সহচর ছিলেন না? পবিত্র কোরআনের পরবর্তী আয়াত এর চেয়েও বিস্ময়কর ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে। এরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ, “এদের মধ্যে একটি দল (মদীনার কোন কোন ব্যক্তি যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হয়েছিল তাদেরকে উদ্দেশ্য করে) বললো, তোমাদের অবস্থান করার জায়গা এটি নয়, নিজ গৃহে ফিরে যাও।” অতঃপর একটি দল হুজুর পাক (সাঃ) এর খেদমতে উপস্থিত হল এবং আহযাবের ময়দান থেকে পালায়নের পথ খুঁজতে লাগলো। একই আয়াতে এরশাদ হচ্ছে, অর্থাৎ, এদের মধ্যে থেকে একটি দল ফিরে যাওয়ার জন্য হুজুর পাক (সাঃ) এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করছিল এবং বলছিল আমাদের বাড়ীতে কেউ নেই। সুতরাং অনুমতি দিন যাতে বাড়ীর নিরাপত্তার জন্য মদীনায় ফিরে যেতে পারি। এ লোকেরা মিথ্যা বলছিল, তাদের বাড়ী মানব শুন্য ছিল না। তারা শুধুমাত্র পলায়নের অজুহাত খুঁজছিল।” এখন আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিন এ ধরনের ঘটনা থেকে চোখ কিভাবে নির্লিপ্ত রাখা যায় এবং তাদের সমালোচনা কেন জায়েজ হবে না? কোন কোন সাহাবা নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি খেয়ানতের ন্যায় জঘন্য অপবাদ আরোপ করেছেন এবং পবিত্র কোরআনে সুরা আল-ইমরানের ১৬১ নং আয়াতে এরশাদ হচ্ছে, “কোন নবী খেয়ানত করবে তা একেবারেই অসম্ভব এবং যারা খেয়ানত করবে কেয়ামতের দিন যে ধরনের খেয়ানত করেছে তাকে সাথে নিয়ে আসবে। অতঃপর তাদেরকে তাদের আমলের প্রতিদান দেয়া হবে এবং কারোর প্রতি কোন অন্যায় করা হবে না।” অর্থাৎ, শাস্তি দেয়া হলেও তা হবে তাদের কৃতকর্মের জন্য। এ আয়াতের দু’টি শানে নযুল বর্ণনা করা হয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর-এর বন্ধুদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে যখন তারা ওহুদের যুদ্ধে ‘আয়নীন’ নামক আত্মরক্ষা বুহ্যে অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্বে যখন মুসলমান বাহিনী দুশমনদের উপর বিজয় লাভ করে তখন আব্দুল্লাহর সাথে তীরন্দাজ বাহিনী ছিল। যদিও আল্লাহর নবী (সাঃ) তাদেরকে নিজ নিজ স্থান থেকে না সরার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ ঐ দলটি নিজ নিজ স্থান ত্যাগ করলো এবং গনিমতের মাল লুট করার জন্য ছুটে গেল। এর চেয়েও আপত্তিকর আচরণ ছিল তাদের কথাবার্তা। তারা বলতো যে, আমরা শংকিত যে রাসুল (সাঃ) আমাদের হক আদায় করবেন না। (আর তারা এমন ধরনের বাক্য উচ্চারণ করতো যা লিখতে কলম লজ্জা পাবে)।
ইবনে কাসির ও তাবারী উক্ত আয়াতের তাফসীরে অপর একটি শা’নে নযুলের কথা উল্লেখ করেছেন। বদর যুদ্ধের সাফল্যের পর একটি লাল রংয়ের কাপড় হারিয়ে যায়। কোন কোন মুর্খ ও স্বল্পবুদ্ধির অধিকারী লোকেরা হুজুর পাক (সাঃ) এর উপর খেয়ানতের অপবাদ দিল। কিছুক্ষণ পরই হারিয়ে যাওয়া কাপড়টি পাওয়া যায়। জানা গেল, বাহিনীতে উপস্থিত অমুক ব্যক্তি কাপড়টি তুলেছিলেন।
হুজুর পাক (সাঃ) এর প্রতি এ ধরনের অনাকাংখিত অপবাদ আরোপ করা সত্ত্বেও কি সাহাবাদের আদালত বা ন্যায়পরায়ণতা অবশিষ্ট থাকে? এ সকল ঘটনা জানা সত্ত্বেও কী তারা পাক ও পবিত্র ছিলেন এবং তাদের সমালোচনা করার অধিকার নেই বলা কি সঠিক হবে?
@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@
বাস্তব ও কোরান হাদিসের দৃষ্টিতে সাহাবীগনঃ ২-(শেষ পর্ব)
আমি অস্বীকার করি না যে, হুজুর পাক (সাঃ) এর অধিকাংশ সাহাবী ও সাথী তাকওয়া সম্পন্ন এবং নির্মল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সকলের জন্য একই হুকুম ও দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা এবং সবার উপর তাকাওয়া ও আদালতের প্রলেপ চড়িয়ে তাদেরকে কোন প্রকার সমালোচনা করার অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার বিষয়টি সত্যিই আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা।
এটা কেমন ন্যায়পরায়ণতা যে একজন ব্যক্তি যিনি বাহ্যতঃ রাসুল (সাঃ) এর একজন সাহাবী হিসেবে গণ্য (আমার উদ্দেশ্য মাবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান) তিনি রাসুল (সাঃ) এর অত্যন্ত মর্যাদাবান সাহাবী হযরত আলী (আঃ) এর উপর বছরের পর বছর ধরে লানত বর্ষণ করার নির্দেশ জারী করেন। নিম্নের দু’টি হাদীসের প্রতি আপনাদের মনযোগ আকর্ষণ করছি।
(১) আহলে সুন্নাতের গুরুত্বপূর্ণ হাদীস গ্রন্থ সহীহ মুসলিম-এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে এভাবে, “মুয়াবিয়া সা’দ বিন আবি ওক্কাসকে বললেন, কেন আবু তোরাবের (আলী ইবনে আবি তালিব) প্রতি লানত বর্ষণ করা থেকে বিরত থাক?
তিনি বললেন, “আমি তাঁর ফজিলত সম্পর্কে হুজুর (সাঃ) এর এমন তিনটি হাদীস শুনেছি যদি এগুলো আমার সম্পর্কে হতো তাহলে আমার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধন দৌলতের চেয়ে অধিক গুরুত্ববহ হতো। এ কারণেই আমি নিজেকে বিরত থাকি। (সহীহ মুসলিম, খঃ ৪, পৃঃ ১৮৭১, সহীহ বুখারী, খঃ ৭, পৃঃ ৬০)
(২) আহলে সুন্নাতের বুজুর্গ আলেমে দ্বীন ইবনে আব্দুর রাবাহ আন্দালুসি স্বীয় আল আকাদুল ফরিদ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন যে, ইমাম হাসান ইবনে আলী (আঃ) শাহাদাতবরণ করার পর মুয়াবিয়া মক্কা সফর করে মদীনায় আগমন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মসজিদে নববীতে রাসুল (সাঃ) এর মিম্বার থেকে হযরত আলী (আঃ) এর উপর লানত করবে। উপস্থিত লোকেরা বললো, মসজিদের অভ্যন্তরে সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসও উপস্থিত আছে এবং আমাদের ধারণা সে তোমার এ উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্থন জানাবে না এবং তীব্র প্রতিবাদ করবে। সুতরাং তার কাছে কাউকে পাঠিয়ে তার মতামত জেনে নাও।
মুয়াবিয়া সা’দ এর কাছে জনৈক ব্যক্তিকে পাঠালেন এবং তাঁর মতলব সম্পর্কে খোঁজ খবর নিলেন। সা’দ উত্তরে বললেন যে, যদি মুয়াবিয়া এমন কাজ করে তাহলে আমি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এ মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাব, আর কখনও এখানে প্রবেশ করব না।
মুয়াবিয়া এ সংবাদ শোনার পর গালমন্দ দেয়া থেকে বিরত থাকল। ইত্যবসরে সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস পরলোক গমন করেন। সা’দের মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া মেম্বার থেকে হযরত আলী (আঃ) এর উপর লানত বর্ষণ শুরু করলো এবং তার সহযোগীদেরও এ কাজের নির্দেশ দিল। তারাও মুয়াবিয়াকে অনুস্মরণ করল। এ ঘটনার সংবাদ যখন রাসুল (সাঃ) এর স্ত্রী উম্মে সালমার কানে গেল তিনি মুয়াবিয়ার নামে একটি পত্র পাঠালেন। তিনি লিখলেন, “তুমি কেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) এর উপর অভিসম্পাত করছ! তুমি কেন বলছো না যে, আলী (আঃ) এবং তাঁর মহব্বতকারীদের উপর লানত, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তায়ালা হযরত আলী (আঃ) কে ভালবাসেন এবং আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ও তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসেন। অতএব, তুমি সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সাঃ) উপর লানত বর্ষণ করছ”।
মুয়াবিয়া উম্মে সালমার (রাঃ) পত্র পাঠ করে কিন্তু তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ প্রদর্শন করেনি। (আল উকাদ আল ফরিদ, খঃ ৪, পৃঃ ৩৬৬ এবং জাওয়াহীর আল মাতালিব ফি মানকিবে ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব, খঃ ২, পৃঃ ২২৮, লেখক মুহাম্মাদ বিন আহমেদ আল মাশকী আল শাফায়ী)
এমন ধরনের মন্দ কর্ম কি ন্যায়বিচারের সাথে সামঞ্ছস্যপূর্ণ? কোন জ্ঞানবান বা ন্যায়বান ব্যক্তি কি হযরত আলী (আঃ) এর মত একজন মহান ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এমন নির্লজ্য ও ব্যাপকভাবে গালমন্দ করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে?
জনৈক আরব কবি তার কবিতায় বলেন, যার অর্থ হচ্ছে, “মিম্বার থেকে এমন ব্যক্তিত্বের উপর কি অভিসম্পাত দিচ্ছ যার তরবারীর কল্যাণে এই মিম্বারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে”।
৭) নবী করিম (সাঃ) এর সাহাবীদের প্রকার ভেদঃ ******************************************* আল্লাহর নবী (সাঃ) এর সাহাবীদেরকে পবিত্র কোরআনের সাক্ষ্য অনুযায়ী পাঁচটি দলে বিভক্ত করা যেতে পারে।
(১) পবিত্র ও নেককার সাহাবীঃ এ দলে অন্তর্ভূক্ত সাহাবীগণ মুমিন ও ইখলাসের (শুধু আল্লাহর সন’ষ্টির জন্য কোন কাজ করা) অধিকারী ছিলেন? ঈমান তাঁদের হৃদয়ের গভীরতম স্থানে প্রবৃষ্ট হয়েছিল। এঁরা আল্লাহর পথে এবং ইসলামের কলেমার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে যে কোন ধরনের ত্যাগ স্বীকারে পিছপা হতেন না। এ দলটির প্রতিই সুরা তাওবাহ’র ১০০ নং আয়াতে এ মর্মে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর দয়ার প্রতি সন্তুষ্ট।
(২) মুমিন অথচ ভুল ভ্রান্তি যুক্ত সাহাবীঃ এ দলটি সেই যারা ঈমান ও নেককার হওয়া সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে পদস্খলনের শিকার হতেন এবং ন্যায় অন্যায়কে মিশ্রিত করে ফেলতেন এবং নিজ গোনাহের স্বীকারোক্তিও করতেন। যেমন সুরা তাওবাহয় ইরশাদ হচ্ছে “আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেক কাজ ও অন্য একটি বদ কাজ। শীঘ্রই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। সুরা তাওবার এ আয়াত অনুযায়ী তারা হয়ত ক্ষমা প্রাপ্ত হবে। (সুরা তাওবাহঃ ১০২)
(৩) গোনাহ সম্পাদনকারী সাহাবী ঃ এ দলটিকে পবিত্র কোরআন ফাসেক পাপাচারীর নামে অবহিত করেছে। এরশাদ হচ্ছে যে, “যদি কোন ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের জন্য সংবাদ আনয়ন করে তাহলে প্রকৃত প্রমাণ ছাড়া তা গ্রহণ করবেন না……।” শিয়া-সুন্নী সকল মুফাসসীরগণ তাদের তাফসীর গ্রন্থে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। (সূরা হুজরাতঃ ৬)
(৪) সাহাবী যারা বাহ্যতঃ মুসলমান ছিলেনঃ এ দলের সদস্যগণ মুসলমান হওয়ার দাবী করতেন কিন্তু ঈমান তাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। সুরা হুজরাতের ১৪ নং আয়াতে এ দলটি সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ, “মরুবাসীরা বলে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। বলুনঃ তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করনি; বরং বল, আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি…….”।
(৫) মুনাফেকদের দলঃ এটা সেই দল যারা কপটতা নিয়ে মুসলমানদের মাঝে আত্মগোপন করেছিলেন। কখনও তাদের পরিচয় স্পষ্ট হতো আবার কখনও হতো না। এরা ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পিছপা হতো না। সুরা তাওবাহতেই মুমিন ও নেককার দলের প্রতি ইঙ্গিত করার পর ১০১ নং আয়াতে মুনাফিকদের সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ, “আর কিছু কিছু তোমার আশ পাশের মুনাফেক এবং কিছু লোক মদীনাবাসী কঠোর মুনাফেকীতে অনঢ়। তুমি তাদের জাননা; আমি তাদের জানি…….।”
নিশ্চয়ই উপরোল্লিখত সকল দল হুজুর পাক (সাঃ) কে স্বচক্ষে দর্শন করেছিলেন এবং হুজুর (সাঃ) এর সাথে তাদের ওঠা বসা এবং সম্পর্ক ছিল এবং এদের মধ্যে অনেকেই জিহাদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং সাহাবাগণের যে পরিচয় তুলে ধরি না কেন এ পাঁচটি দলের মধ্যেই তাদের পরিচয়ের সত্যতা নিহিত। তাহলে সকলকেই কী পবিত্র ও জান্নাতের অধিকারী বলে গণনা করা যায়? পবিত্র কোরআনের স্পষ্টকরণের পরও কি এটা সঙ্গতঃ হবে না যে, আমরা সংযমের পথ গ্রহণ করে সাহাবীগণকে পবিত্র কোরআনের বর্ণনা মতে পাঁচটি দলে বিভক্ত করি এবং এদের মধ্যে যাঁরা খোদাভীরু ও তাকওয়া সম্পন্ন তাঁদেরকে তাঁদের প্রাপ্ত সম্মান ও মর্যাদা দান করি এবং অবশিষ্ট দলের প্রত্যেককে তাদের স্ব স্ব অবস্থানের উপর রাখার চেষ্টা করি এবং হিংসা, বিদ্বেষ ও উগ্রতার পথ পরিহার করে ন্যায় নীতির ভিত্তিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
৮) ঐতিহাসিক সাক্ষ্যঃ ******************** সকল সাহাবাদের সত্যবাদীতা ও ন্যায়পরায়ণতায় বিশ্বাসী এবং এর সমর্থকদের জন্য অনেক কঠিন সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এ সমস্যাবলীর পশ্চাতে ঐতিহাসিক সত্যতা বর্তমান। কেননা, তাদের প্রসিদ্ধ ও বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক গ্রন্থ’সমূহে এমনকি সিহাহ সিত্তাহর হাদীসগুলোতে কোন কোন সাহাবার মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাদী ও বিবাদীকে ন্যায়পরায়ণ, নেককার এবং পবিত্র হিসেবে গণনা করা যায় না কেননা এ ধরনের ঘটনা দু’বৈপরীত্যশীল চিন্তাধারারই ফসল এবং দু’বৈপরীত্যশীল চিন্তাধারার সমন্বয় না হওয়াটাই স্বাভাবিক যা অস্বীকার করা অসম্ভব।
জামাল (উষ্ট্রের যুদ্ধ) ও সিফফীনের যুদ্ধে যেখানে তালহা, যুবাইর ও মুয়াবিয়া ইমামুল মুসলিমীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) এর বিপক্ষে অবতীর্ণ হয়েছিলেন আমরা যদি এ ঘটনার সত্যতাকে এড়িয়ে না যাই তাহলে নিশ্চিতরূপে যুদ্ধের উস্কানী দাতাদের ত্রুটি বিচ্যুতি স্বীকার করতে হবে এবং এ সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণ মজুদ আছে। এখানে আমি মাত্র তিনটি ঘটনা উল্লেখ করব।
(১) ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থের কিতাবুল তাফসীরে উফুকের মাসআলা বিষয়ে (হুজুর পাক (সাঃ) এর স্ত্রী সম্পর্কে যে অপবাদ দেয়া হয়েছিল) উল্লেখ করেন যে, একদিন পয়গম্বর (সাঃ) মিম্বারে তাশরীফ আনলেন এবং এরশাদ করলেন, “হে মুসলমানগণ! কে ঐ ব্যক্তিকে শাস্তি দেবে (উদ্দেশ্য ছিল আব্দুল্লাহ বিন সালুল যে মুনাফিকদের দলপতি ছিল)। আমাকে বলা হয়েছে যে, সে আমার স্ত্রীর প্রতি অপবাদ দিয়েছে। যদিও আমি আমার স্ত্রীর মধ্যে এমন কিছু দেখিনি……..”। সা’দ বিন মা’য়াজ আনসারী (বিখ্যাত সাহাবী) উঠে দাঁড়ালেন এবং আরজ করলেন, “আমি একে শাস্তি দেব। যদি সে আউস গোত্রভূক্ত হয় তাহলে আমি তার গর্দান কর্তন করব। আর যদি সে খাজরাজ গোত্রভূক্ত হয় তাহলে আপনি যে নির্দেশ প্রদান করবেন আমি তা পালন করব”। খাজরাজ গোত্র প্রধান সা’দ বিন উবাদা যিনি পূর্বে ভাল লোক ছিলেন গোত্র প্রতিহিংসার কারণে সা’দ বিন মায়াজের উদ্দেশ্যে বললেন, আল্লাহর কসম তুমি মিথ্যা বলছো। তোমার এত ক্ষমতা নেই যে তুমি এ কাজ করতে পার। আসীদ বিন খুজাইর (সা’দ বিন মা’য়াজের চাচাতো ভাই) উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে থাকলেন, “আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যাবাদী। এই ব্যক্তি মুনাফিকদের অন্তর্ভূক্ত আমি একে নিশ্চয়ই হত্যা করব। আউস এবং খাজরাজ গোত্রের মধ্যে প্রায় যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হলে হুজুর পাক (সাঃ) তাদেরকে সংযত থাকার নির্দেশ দিলেন। (সহীহ বুখারী, খঃ ৫, পৃঃ ৫৭)
(২) বিখ্যাত আলেম বালাজারী স্বীয় গ্রন্থ ‘আল ইসাহ’-এ লিখেন যে, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস কুফার শাসক ছিলেন। হযরত উসমান তাকে পদচ্যুত করেন এবং ওলীদ বিন ওকাবাকে তার স্থলে শাসক মনোনিত করেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ সে সময় বায়তুল মালের খাজাঞ্চি ছিলেন। ওলীদ যখন কুফায় প্রবেশ করলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে রক্ষিত বায়তুল মালের চাবি তলব করলেন। আব্দুল্লাহ চাবির গুচ্ছ ওলীদের সম্মুখে ছুড়ে ফেলে বললেন, “খলীফা রাসুল (সাঃ) এর সুন্নতকে পরিবর্তন করেছেন। সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসের ন্যায় ব্যক্তিকে বরখাস্ত করে ওলীদের ন্যায় ব্যক্তিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছেন”।
ওলীদ হযরত উসমানকে পত্র লিখে জানালেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ সমালোচনা করেছে। খলিফা উত্তরে লিখলেন যে, তাকে সরকারী প্রহরায় আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ মদীনায় যখন প্রবেশ করলেন সে সময় খলিফা মিম্বারের উপরে উপবিষ্ট ছিলেন। যে মুহূর্তে খলিফার দৃষ্টি ইবনে মাসউদের উপর পড়ল তিনি তখন বলতে থাকলেন, “মন্দ জানোয়ার প্রবেশ করেছে। আরো অনেক গালমন্দ করলেন যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না”।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন, আমি এমন নই। আমি আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) সাহাবী। বদরের যুদ্ধে এবং বাইতুর রিজওয়ানে শরীক ছিলাম।
হযরত আয়শা আব্দুল্লাহর সমর্থনে দণ্ডায়মান হলেন, কিন্তু হযরত উসমানের ক্রীতদাস আব্দুল্লাহকে মসজিদের বাইরে নিয়ে গেল এবং মাটিতে আছাড় মারলো যার দরুন তার পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে যায়। (ইনসাব আল আশরাফ, খঃ ৬, পৃঃ ১৪৭, তারিখ ইবনে কাসির, খঃ ৭, পৃঃ ১৬৩, ১৮৩)
(৩) বালাজারী একই গ্রন্থে অর্থাৎ ইনসাব আল আশরাফে বর্ণনা করেছেন যে, মদীনার বায়তুল মালে বেশকিছু মনিমুক্তা ও অলংকার ছিল। হযরত উসমান এরমধ্যে থেকে কিছু অলংকার তার পরিবারের সদস্যদের জন্য দান করলেন। ঘটনাটি জনগণের দৃষ্টিগোচর হলে তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ ও আপত্তি জানাতে শুরু করে এবং তাদের সম্পর্কে জঘন্য মন্তব্য করে। হযরত উসমান এতে খুবই রাগান্বিত হন। মিম্বারে গিয়ে বলেন, “আমি গনিমতের মাল থেকে আমার প্রয়োজন মোতাবেক গ্রহণ করব যতই প্রতিবাদ ও আপত্তি উত্থাপন করা হোক না কেন!!
এ বক্তব্য শুনে হযরত আলী (আঃ) বললেন, “মুসলমান স্বয়ং তোমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।”
হযরত আম্মার ইয়াসীর বললেন, “সর্বপ্রথম আমার নাসিকা মাটির সাথে ঘষা হবে”। এ কথার অর্থ আমি প্রতিবাদ করা থেকে বিরত থাকব না।
হযরত উসমান ভীষণভাবে ক্ষেপে উঠলেন এবং বললেন, তুমি আমার শানে বেআদবী করেছ। একে বন্দী কর। জনগণ আম্মারকে বন্দী করে হযরত উসমানের গৃহে নিয়ে যায়। সেখানে হযরত আম্মারকে এমনভাবে প্রহার করা হয় যে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর তাঁকে উম্মে সালমার (রাসুল (সাঃ) এর স্ত্রী) গৃহে নেয়া হয় তখনও তিনি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন এমনকি তাঁর যোহর, আসর ও মাগরিবের নামাজ ক্বাযা হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরে পেলে তিনি ওযু করে নামাজ আদায় করলেন এবং বললেন, এমন ঘটনা প্রথমবার ঘটেনি যে আল্লাহর জন্য আমার উপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়েছে। (তাঁর ইঙ্গিত অন্ধকার যুগের প্রতি ছিল যখন কাফেরদের অত্যাচার নির্যাতন তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল।) (ইনসাব আল আশরাফ, খঃ ৬, পৃঃ ১৬১)
আমি কখনো চাইনা যে, ইসলামের ইতিহাসের এমন অনাকাংখিত ও অনভিপ্রেত ঘটনাবলী উল্লেখ করি। যদি আহলে সুন্নাতের ভাইয়েরা সকল সাহাবী ও তাঁদের কর্মকান্ডের পবিত্রতার স্বপক্ষে জেদ না ধরতেন তাহলে এত কথা বলার প্রয়োজন হতো না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাসুল (সাঃ) এর সাহাবীদের মধ্যে তিনজন পবিত্রতম সাহাবীকে (সা’দ বিন মা’য়াজ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আম্মার ইয়াসির) গালমন্দ করা এবং প্রহার করার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? একজন মর্যাদাবান সাহাবীকে এমনভাবে প্রহার করা হয় যার কারণে পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে যায় এবং অপরজন প্রহারের কারণে অজ্ঞান হয়ে যান ফলে তার নামাজ কাযা হয়। এ দুঃখজনক ঘটনাবলী থেকে আমাদের দৃষ্টি কী ফিরিয়ে নিতে পারি যার সাক্ষ্য ইতিহাস দিচ্ছে? আমরা কি বলতে পারি সকল সাহাবীর কর্মকান্ড সঠিক ছিল এবং ‘সিপাহে সাহাবা’ নামে একটি সিপাহী দল গঠন করে তাদের সকল কর্মকান্ডকে বৈধ আখ্যায়িত করে তাদেরকে সমর্থন জানাই, কোন জ্ঞান বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি কি এ ধরনের চিন্তা ভাবনা পছন্দ করবে?
এখানে আবারও বলতে হয় যে, রাসুল (সাঃ) এর সাহাবীদের মধ্যে মুমিন, সালেহ ও পূণ্যবান সাহাবীর সংখ্যা অনেক ছিল। কিন্তু এমন কিছুসংখ্যক সাহাবীও ছিলেন যাদের কর্মকান্ড সমালোচনার উর্দ্ধে ছিল না। তাদের কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করে আকল এর মাপকাঠিতে পরিমাপ করে তাদের সম্পর্কে শরয়ী ফায়সালা করা উচিৎ।
৯) পয়গম্বর (সাঃ) এর যুগে অথবা তৎপরবর্তীকালে কোন কোন সাহাবার উপর হাদ্দ বা শাস্তি জারী হওয়াঃ ****************** সিহাহ সিত্তা অথবা আহলে সুন্নাতের অন্যান্য প্রখ্যাত ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সমূহে এমন কিছু বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে যেখানে কোন কোন সাহাবী রাসুল (আঃ) এর যুগে বা তৎপরবর্তীকালে তাদের দ্বারা এমন গোনাহ সংঘটিত হয়েছিল যার কারণে তাদের উপর শাস্তি জারী হয়। এ ঘটনার পরও কি বলা যাবে তারা সকলে ন্যায়বান ছিলেন আর তাদের দ্বারা ভুল কর্ম সম্পাদন হয়নি? এ কেমন আদালত বা ন্যায়পরায়ণতা যে, গোনাহর কারণে শাস্তি পেতে হয় এবং তারপরও তাদের ন্যায়পরায়ণতা নিজের জায়গায় বহাল থাকে?
আমি নিম্নে এমন কিছু ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করার চেষ্টা করবঃ ***********
এক) ‘নামীয়ান’ নামের জনৈক সাহাবী মদ্য পান করলে হুজুর (সাঃ) হুকুম জারী করলেন এবং তাকে চাবুক মারা হয়। (সহীহ বুখারী, খঃ ৮, পৃঃ ১৩, হাদীস নং-৬৭৭৫, কিতাবুল হাদ্দ অধ্যায়)
দুই) বনি আসলাম গোত্রের জনৈক পুরুষ ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। নবী করিম (সাঃ) এর নির্দেশে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। (সহীহ বুখারী, খঃ ৮, পৃঃ ২২, হাদীস নং ৬৮২০)
তিন) পয়গম্বর (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর আব্দুর রহমান বিন উমর ও উকবা বিন হারিছ বদরী মদ্যপান করে এবং মিশরের আমীর উমর ইবনে আস তার উপর শরয়ী শাস্তি জারি করেন। এরপর উমর দ্বিতীয়বার স্বীয় পুত্রকে ডাকলেন এবং পুনরায় তার উপর হাদ্দ জারি করলেন। (আল সুনান আল কুবরা, খঃ ৮, পৃঃ ১৩১২ এবং অন্যান্য গ্রন্থে দ্রষ্টব্য)
চার) ওলিদ বিন উকবার একটি বিখ্যাত ঘটনা হল-তিনি মদ পান করলেন এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ফজরের নামাজ চার রাকাত স্বীয় ইমামতিতে পড়ালেন। তাকে মদীনায় প্রেরণ করা হয় এবং মদ পানের অপরাধে শাস্তি দেয়া হয়। (মুসলিম, খঃ ৫, পৃঃ ১২৬, হাদিস নং ১৭০৭)
এছাড়াও এমন আরও অনেক ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায় যার উল্লেখ উপযোগী হবে না বিধায় বিরত থাকছি। এরপরও কি সত্যের সামনে চক্ষু কর্ণ নির্লিপ্ত রেখে তাদের সকলকে ন্যায় ও পূণ্যবান বলব?
১০) অসত্য ও ভ্রান্তিপূর্ণ বর্ণনাঃ *************************** ক) বলা হয়ে থাকে যে, সকল সাহাবীরা মুজতাহীদ ছিলেন এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ ইজতিহাদ অনুযায়ী আমল করেছেন। এ ধরনের চিন্তা বা কথা নিজের বিবেককে ধোকা দেয়া ছাড়া অন্য কিছু না। বায়তুল মাল আত্মসাৎ করা সম্পর্কে সামান্য একটু সমালোচনা এবং স্পষ্টতঃ সৎ কর্মের নির্দেশ এবং অসৎ কর্ম থেকে বিরত থাকার মোকাবিলায় একজন মুমিন সাহাবীকে এমন নির্দয়ভাবে প্রহার করা যে, সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং তার নামাজ কাযা হয় এটা কি ইজতিহাদ? একজন বিখ্যাত সাহাবীর পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে ফেলা শুধুমাত্র এ আপত্তির কারণে যে কেন সে একজন মদ পানকারীকে কুফার শাসনকর্তা নিয়োগ দিল এটা কী ইজতিহাদ বলে গণ্য হবে?
অধিকিন্তু’ ইমামুল মুসলিমিনের মোকবিলায় যিনি আল্লাহকর্তৃক মনোনিত ও উচ্চাসন প্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি মুসলমানদের দ্বারা নির্বাচিত ও নিরবিচ্ছিন্ন খলীফা ছিলেন, উচ্চপদ ও ক্ষমতা লাভের জন্য যুদ্ধের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে দেয়া যেখানে হাজার হাজার মুসলমানের রক্তের বন্যা বয়ে গেল, এও কি ইজতিহাদের মধ্যে গণ্য হবে?
এ সকল ঘটনাগুলো যদি ইজতিহাদ বলে গণ্য হয় তাহলে দীর্ঘ ইতিহাসে সংঘটিত সকল ঘটনাবলী কি এমনভাবেই বিচার্য হবে? এছাড়া কি ইজতিহাদ কেবল সাহাবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল নাকি অন্ততঃপক্ষে কয়েক শতাব্দী পরও ইসলামী উম্মতে অধিকসংখ্যক মুজতাহিদের উপস্থিতি বিরাজমান ছিল? বরং আহলে সুন্নাতের কতিপয় আলেমের স্বীকারোক্তি এবং সকল শিয়া আলেমগণের মতানুযায়ী আজও সকল প্রজ্ঞাবান আলেমের জন্য ইজতিহাদের দরজা উন্মুক্ত আছে।
যে সকল ব্যক্তি এধরনের ভয়ঙ্কর কর্মে লিপ্ত হন আপনারা কি তাদের এ কর্মের সমর্থনে এগিয়ে আসবেন? নিশ্চই না।
খ) কখনো বলা হয়ে থাকে যে, আমাদের দায়িত্ব হলো তাদের ব্যাপারে নীরবতা পালন করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, অর্থাৎ, “আমরা সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ। তারা ছিল এক সমপ্রদায় যারা গত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে, তা তাদেরই জন্যে। তারা কি করত, সে সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না।” (সুরা বাক্বারাঃ ১৩৪)
কিন্তু প্রশ্ন হল যদি তাঁরা (সাহাবা) আমাদের জন্য আদর্শ না হতেন অথবা আমাদের নিয়তির ক্ষেত্রে তারা কোন প্রভাব না রাখতেন তাহলে বিষয়টি সঠিক ছিল। কিন্তু আমরা চাই মহানবী (সাঃ) এর রেওয়াতসমূহ তাঁদের মাধ্যমেই গ্রহণ করি এবং সেগুলোকে নিজেদের জন্য পথ নির্দেশক হিসেবে জ্ঞান করি। তাহলে এক্ষেত্রে আমাদের কী অধিকার নেই কারা ফাসেক ও কারা আদেল এ বিষয়টি স্পষ্ট করি? পবিত্র কোরআনও বিষয়টি সমর্থন করে। এরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ, “যখন কোন ফাসেক তোমাদের নিকট সংবাদ নিয়ে আসে তবে তা যাচাই বাছাই কর”। (সুরা হুজরাতঃ ৬)
১১) হযরত আলী (আঃ) এর অত্যাচারিত অবস্থাঃ ********************************************* যে ব্যক্তিই ইসলামী ইতিহাস অধ্যয়ন করবে সে এ বিষয়টিকে খুব সহজেই বুঝতে পারবে যে, হযরত আলী (আঃ) যিনি জ্ঞান ও পরহেজগারিতায় পর্বততুল্য, পয়গম্বর (সাঃ) এর অত্যন্ত নিকটে অবস্থানকারী সঙ্গী এবং যিনি ইসলামের সবচেয়ে বড় হেফাজতকারী ছিলেন তাঁকে অসম্মান, অমর্যাদা ও অত্যাচারের নিশানা বানানো হয়। তাঁর সঙ্গী ও শুভাকাঙ্খীদের এমন বেদনাদায়ক কষ্ট ও অত্যাচারে জর্জরিত করা হয় যে, ইতিহাসে তার নজীর মেলা ভার। তাও আবার এমন ব্যক্তিদের দ্বারা যারা নিজেদেরকে পয়গম্বর (সাঃ) এর সাহাবী বলে গণ্য করেন।
কিছু দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা হলঃ
ক) জনগণ আলী ইবনে জাহাম খোরাসানীকে দেখল যে, সে স্বীয় পিতার উপর লানত বর্ষণ করছে। এমন করার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে সে বললো যে, এ কারণে লানত বর্ষণ করছি যেহেতু আমার পিতা আমার নাম রেখেছে আলী। (লিসানুল মিজান, খঃ ৪, পৃঃ ২১০)
খ) মুয়াবিয়া তার সকল কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বিধিপত্রে লিখলো যে, যে ব্যক্তিই আবু তোরাব (ইমাম আলী (আঃ) এর অন্যতম উপাধি) এবং তার পরিবারের কোন ফজিলত বর্ণনা করবে সে আমার আশ্রয়চ্যুত হবে (তার প্রাণ ও সম্পদ মুবাহ অর্থাৎ হালাল)। এ বিধি জারির পর থেকে সর্বত্র মিম্বার থেকে আলী (আঃ) এর উপর লানত বর্ষণ এবং তাঁর প্রতি অসন’ষ্টি প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়। (আল নাসায়েহ আল কাফিয়া, খঃ ৭২)
গ) বনি উমাইয়ার কোন ব্যক্তি যখনই শুনতো যে সদ্যজাত কোন সন্তানের নাম আলী রাখা হয়েছে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করা হতো। এ বর্ণনাটি সালমাহ বিন শাবীব আব্দুর রহমান আক্‌রী থেকে বর্ণনা করেছেন। (তাহজীব আলকামাল, খঃ ২০, পৃঃ ৪২৯ এবং সায়রুল অলাম আল নাব্‌লা, খঃ ৫, পৃঃ ১০২)
ঘ) যামাখ্‌শারী ও সয়্যুতী বর্ণনা করেন যে, বনি উমাইয়ার শাসন আমলে সত্তর হাজারেরও অধিক মিম্বার থেকে আলী (আঃ) এর উপর লানত বর্ষণ করা হতো এবং এ বিদাআতটি মুয়াবিয়া চালু করেছিল। (রাবিউল আবরার, খঃ ২, পৃঃ ১৮৬ ও আল নাসায়েহ আল কাফিয়া, খঃ ৭৯)
ঙ) যখন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ বিদআত বন্ধ করার হুকুম জাতির করলেন এবং জুমা’র খুৎবায় আমীরুল মুমিনীন আলী (আঃ) কে গালিগালাজ না করার নির্দেশ দিলেন তখন মসজিদে উপস্থিত মানুষদের মাঝে রব উঠলো, তুমি সুন্নত বর্জন করেছ, তুমি সুন্নত বর্জন করেছ। (আল নাসায়েহ আল কাফিয়া, খঃ ১১৬)
আহলে সুন্নাতের প্রসিদ্ধ ও বিশ্বস্ত গ্রন্থ’সমূহের বর্ণনা মতে হুজুর পাক (সাঃ) এরশাদ করেন, যে আলীকে গালমন্দ করে সে আমাকে গালমন্দ করেছে আর যে আমাকে গালমন্দ করেছে সে আল্লাহকে গালমন্দ করেছে। (মুসতাদরক আল সহীহায়ন, খঃ ৩, পৃঃ ১২১)
১২) একটি চমকপ্রদ উপাখ্যানঃ উপসংহারে হয়তো এ ঘটনাটি উল্লেখ করা অসমীচীন হবে না যেটি হযরত আয়াতুল্লাহ আল উযমা মাকারেম সিরাজী হুজুরের সাথে মসজিদুল হারামে ঘটেছিল।
হুজুর বলেন, একবার যখন উমরাহতে যাওয়ার সুযোগ হল একদিন রাতের বেলায় মাগরিব ও এশার নামাজের মধ্যবর্তী সময় আমি মসজিদুল হারামে বসে ছিলাম এমন সময় কিছু হেজাজের আলেমদের সাথে সকল সাহাবার পবিত্রতা ও ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে বাহাস শুরু হয়। তারা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস রাখতেন যে, সাহাবা কেরাম সম্পর্কে সামান্যতম সমালোচনাও করা উচিৎ নয়। আমি তাদের মধ্যে থেকে জনৈক আলেমের উদ্দেশ্যে বললাম-ধরুন, এ মুহূর্তে সিফফীনের যুদ্ধ অব্যাহত আছে, আপনি দু’দলের মধ্য থেকে কোন দলটিকে বেছে নেবেন? আলীর দল নাকি মুয়াবিয়ার দল?
নিশ্চিতরূপে আলীর দলকে বেছে নেব। তিনি উত্তর দিলেন। আমি বললাম-যদি হযরত আলী (আঃ) আপনাকে নির্দেশ দেন যে, এই তরবারি দ্বারা মুয়াবিয়াকে হত্যা কর সে ক্ষেত্রে আপনি কি করবেন?
কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর তিনি উত্তর দিলেন যে, মুয়াবিয়াকে হত্যা করব কিন্তু তারপরও তাঁর সমালোচনা করব না!!
এটাই হল অযৌক্তিক বিশ্বাসের উপর গোঁ ধরে থাকার পরিণাম যখন প্রতিরোধও অযৌক্তি হয়ে পড়ে এবং মানুষ কংকরময় মরুর ফাঁদে পড়ে। সত্য হল এই যে, বলা উচিত পবিত্র কোরআন ও ইতিহাসের সাক্ষ্যমতে হুজুর পাক (সাঃ) এর সাহাবীগণ অংশীকরণ অনুযায়ী কয়েকটি দলে অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। সাহাবীদের একটি দল যারা শুরু থেকে পবিত্র, সত্যবাদী ও ন্যায়বান ছিলেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁরা কল্যাণময় জীবনযাপন করেছেন আর কল্যাণময় মৃত্যুবরণ করেন।
একটি দল এমন ছিল যাঁরা হুজুর পাক (সাঃ) এর জীবদ্দশায় পবিত্র ও ন্যায়বানদের দলে অন্তর্ভূক্ত ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে তারা উচ্চ পদ লাভ ও পার্থিব ভালবাসায় নিজেদের পথ পরিবর্তন করেছিলেন এবং তাঁদের জীবনাবসান কল্যাণময় হয়নি। (যেমন উষ্ট্র ও সিফফীনের আগুন প্রজ্জ্বলনকারীরা)। এবং তৃতীয় দল শুরু থেকে মুনাফিক ও দুনিয়া পুজারীদের সারিতে অন্তর্ভূক্ত ছিল। তারা বিশেষ উদ্দেশ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমানদের সারিতে আত্মগোপন করেছিল যেমন আবু সুফিয়ান ও তার দল। আমি এখানে প্রথম দলটির প্রতি ইঙ্গিত করে পবিত্র কোরআনের সুরা আল হাশর-এর ১০ নং আয়াত উল্লেখ করব, ইরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ, “আর এই সম্পদ তাদের জন্যে যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু পরম করুণাময়। (সুরা আল হাশরঃ ১০)
অতএব, বিবেক সম্পন্ন লোকদের কাছে অস্পষ্ট থাকার কথা নয় যে, সকল সাহাবীই ত্রুটিমুক্ত ছিলেন না । যদি কারও কোন প্রশ্ন থাকে করতে পারেন । প্রাসঙ্গীক সকল প্রশ্নের জবাব দেয়া হবে । বিতর্কের জন্য কেউ আসবেন না । তথ্যভিত্তিক আলোচনার আহবান থাকল। “আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু”।
“আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মদ ওয়া আলে মুহাম্মদ”

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.