আল-কুদ্‌স নিয়ে বৃহৎ শক্তির চক্রান্ত

অধ্যাপক সিরাজুল হক

মুসলিম মিল্লাতের প্রাণকেন্দ্র প্রথম কিবলা আজও অভিশপ্ত ইহুদিদের কবলে। শুধু ‘মসজিদে আকসা’ এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ড কুক্ষিগত করাই ইহুদিদের কাম্য নয়। তারা চাচ্ছে এ ভূখণ্ডে তাদের অবস্থান সংহত করার মাধ্যমে আরব জাহান তথা গোটা মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করতে। তাদের এ সর্বগ্রাসী তৎপরতার পশ্চাতে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করছে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো ও তাদের রঙ্গমঞ্চ (Stage) জাতিসংঘ নামক বিশ্ব সংস্থাটি। কারণ, এ সংস্থাটি ইহুদিবাদের নামান্তর মাত্র। ইহুদিরা যে খুঁটির জোরে ফিলিস্তিনে চেপে বসে আছে, তা হলো বৃহৎ শক্তিবর্গ ও তাদের ষড়যন্ত্রের আখড়া এ সংস্থাটি।

১৯৪৮ সালে ‘জাতিসংঘ’ নামক এ সংস্থাটি অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিন বিভক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করে মধ্যপ্রাচ্য তথা গোটা মুসলিম জাহানে অশান্তির বীজ বপন করে। শুধু তাই নয়, ১৯৪৮ সালে সংঘটিত আরব ইসরাইল যুদ্ধের পর মুসলিম মুজাহিদদের পুনর্বাসন থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো বিপজ্জনক পরিস্থিতি মুসলমানদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে, জাতিসংঘ সেসব ব্যাপারে ততটা তৎপর হয়নি, যতটা হয়েছে ইসরাইলের ব্যাপারে।

দেখা গেছে, আরব-ইসরাইলের মধ্যে সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষ ও লড়াইয়ের ব্যাপারে জাতিসংঘ ইহুদিদের পক্ষেই কাজ করেছে। কাজেই জাতিসংঘ নামক এই বিশ্ব সংস্থাটিকে ইহুদিবাদের নামান্তর বললে মোটেই অত্যুক্তি হয় না। আমেরিকার বিখ্যাত আইন ব্যবসায়ী হেনরী ক্লিয়েন (Henry Klein) তাঁর ‘Zions rule the world’ নামক গ্রন্থে অনুরূপ মন্তব্যই করেছেন। তিনি বলেন : The United Nations is Zionism. It is the super government mentioned many times in the protocols of the Learned Elders of Zions promulgated between 1597-1905. এর তরজমা করলে এই দাঁড়ায় যে, জাতিসংঘ ইহুদিবাদেরই অন্য নাম। ১৫৯৭ সাল থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে জারিকৃত ইহুদি পণ্ডিত ও মুরব্বিদের প্রণীত দলিলে পুনঃপুনঃ যে উচ্চতর সরকারের কথা বলা হয়েছে এটা তাই।

বনি ইসরাইল বা ইহুদি সম্প্রদায় হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর বংশধর হলেও তারা একটি অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে। কারণ, তারা একদিকে যেমন খোদাদ্রোহিতায় লিপ্ত হয়েছে, অন্যদিকে তাঁরই প্রেরিত অসংখ্য নবী- রাসূলকে হত্যা করেছে। বহুবার ক্ষমা করার পরেও তারা তাদের সে অবাধ্য আচরণ থেকে প্রত্যাবর্তন করেনি। হযরত মূসা (আ.) দীর্ঘকাল যাবৎ তাদের মুক্তির জন্য ফেরাউনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এই পৃথিবীর বুকে যেখানেই গিয়েছে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।

এসব কর্মফলের দরুনই তারা একটি অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে। সূরা ফাতেহা থেকে শুরু করে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় বনি ইসরাইলদের এই জঘন্য আচরণ ও চরিত্রের কথা বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে এবং একটি অভিশপ্ত জাতি হিসাবে তাদেরকে  ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আল্লাহর সাথে চরম অবাধ্য আচরণ করার কারণে ইহুদিরা যে একটি লাঞ্ছিত জাতিতে পরিণত হয়েছে, ইতিহাসে তার অসংখ্য নজির রয়েছে।

আশুরীয় বাদশা পিয়ার খ্রি.পূ. ৭২৪ সালে ইসরাইলের আবাস ভূমি আক্রমণ করে হাজার হাজার ইহুদিকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে দাসে পরিণত করে। খ্রি.পূ. ৫৬১ সালে ব্যাবিলনের বাদশা বখতে নসর জেরুজালেম আক্রমণ করে এবং ৭০ হাজার ইহুদিকে বন্দি করে নিজ দেশে নিয়ে যায়। অতঃপর ঈসায়ী ৭০ সালে রোমকগণ ইহুদি রাজ্য আক্রমণ করে এবং হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করে। ঈসায়ী ১৩২ সালে রোমকগণ পুনরায় ফিলিস্তিন আক্রমণ করে এবং ইহুদিদের সেখান থেকে বের করে দেয়। এইভাবে ইহুদি জাতি বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু যেখানেই গিয়েছে সেখানেই তারা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। যার ফলে তারা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইটালি ও জার্মানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে, যদিও তারা এখন তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মুরব্বি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার তো অসংখ্য ইহুদিকে হত্যা করেছে যা ইতিহাসের পাঠক মাত্র সকলেই অবগত আছেন।

এখন প্রশ্ন ওঠে ইহুদিদের অবস্থা ও অবস্থান যদি এরূপই হয়ে  থাকে তাহলে পৃথিবীর একশ কোটিরও অধিক মুসলমানকে আজ তারা কি করে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে পারে? প্রকৃতপ্রস্তাবে ইহুদিরা কোন শক্তিই নয়। মুসলিম মিল্লাতের শক্তি ও সামর্থ্যকে খর্ব করার উদ্দেশ্যেই আমেরিকাসহ বৃহৎ শক্তিবর্গ ইহুদিদের ফিলিস্তিনে বসিয়েছে এবং সার্বিকভাবে মদদ যোগাচ্ছে। এর মধ্যে ব্রিটেন ও আমেরিকাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে রাত ১২টার সময় যখন ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের অছিগিরি সমাপ্ত হয় তার ১ মিনিট পরেই ইহুদি নেতা বেন গুরিয়ান স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। আর এর মাত্র ১০ মিনিট পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রু ম্যান ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। কাজেই ব্যাপারটা যে তাদেরই সাজানো ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর সে খেল-তামাসাই আজও অব্যাহত রয়েছে।

ইহুদিরা আজ মুসলিম মিল্লাতের জন্য হুমকিস্বরূপ। তার একটি বড় কারণ রয়েছে। আর তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও নির্ভরশীলতার পরিবর্তে বৃহৎ শক্তিগুলোর মোসাহেবি এবং নিজেদের মধ্যকার দ্বিধাবিভক্তি ও অন্তর্দ্বন্দ্ব মুসলমানদেরকে ইহুদিদের সামনে দুর্বল করে রেখেছে। যার ফলশ্রুতিতে শুধু ইহুদিরাই নয়, বৃহৎ শক্তিগুলো সীমাহীন ফায়দা লুটছে। শুধু তেল সংগ্রহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তাদের নিজস্ব পণ্যের বাজার সৃষ্টি ও কারিগরি দক্ষতা বিক্রি করেই ফায়দা লুটছে না, অধিকন্তু তারা অত্যাধুনিক ভারি অস্ত্র-শস্ত্র সরবরাহ করেও মুসলিম দেশগুলোকে উজাড় ও খতম করে দিচ্ছে। অথচ দেখা গেল ইরাকের পারমাণবিক কেন্দ্র যখন ইসরাইলি বোমার আঘাতে ভস্ম হলো তখন প্রতিবেশী সউদী আরবকে দেয়া মার্কিন রাডার সেট জঙ্গী বিমানগুলো কোন ভূমিকাই পালন করতে পারল না। যদিও সউদী আরব ইরাকের পরম বন্ধু। কাজেই একদিকে ইসরাইলকে কেন্দ্র করে বৃহৎ শক্তিবর্গের পাঁয়তারা, অন্যদিকে আরব তথা মুসলিম মিল্লাতের এহেন নাজুক অবস্থায় আজ ফিলিস্তিন ও আল-কুদ্‌স উদ্ধার তো দূরের কথা, আরব জাহানকে তার অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকাই এক কঠিন ব্যাপার। অথচ ইহুদিদের তুলনায় আরবরা এক বৃহৎ শক্তি।

আর এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেইনী (রহ.) আক্ষেপ করে বলেছেন : ‘আরবরা যদি এক জগ করে পানিও ঢেলে দেয়, তাহলে ইহুদিরা ভূমধ্যসাগরে ভেসে যেতে বাধ্য।’

করণীয় বিষয়

পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন ও বাইতুল মোকাদ্দাসকে আজ  ইহুদিদের কবলমুক্ত করতে হবে। যে পুণ্যভূমি এবং তার চতুষ্পার্শ্বকে আল্লাহ তাআলা অসীম বরকতময় করেছেন, যে স্থানে মানবতার মুক্তির জন্য অসংখ্য নবীর আগমন হয়েছে, সে স্থান থেকে মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মেরাজ যাত্রা শুরু হয়েছে, যে স্থানে স্মরণাতীত কাল থেকে অসংখ্য মুসলিম নার-নারী আল্লাহর দীনের সংরক্ষণের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই পুণ্যভূমি আজও ইহুদিদের কবলে- এটা বিশ্বমুসলিমের জন্য একান্তর লজ্জার কারণ। শুধু তাই নয়, তাদেরকে এ জন্য অবশ্যই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আজ সেখানকার নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে কুরআনের ভাষায় এই বলে ফরিয়াদ করছে : ‘হে আল্লাহ! এই যালেমদের জনপদ থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে যাও। হে আল্লাহ! আমাদের জন্য তোমার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক সাহায্যকারী প্রেরণ কর।’

আজ এই দায়িত্ব মুসলিম মিল্লাতের। তাই মুসলিম মিল্লাতকে সে ঈমান আর প্রাণের জোরে দাঁড়াতে হবে ইহুদিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও যুলুমের বিরুদ্ধে। আল-আকসাকে মুক্ত করতে হলে যতটা লড়াই করতে হবে ইহুদিদের  বিরুদ্ধে, তার চেয়েও অধিক মাত্রায় সংগ্রাম করতে হবে মার্কিন তথা বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। কারণ, ইহুদিদেরকে আমাদের এই পুণ্যভূমিতে যারা বসিয়েছে, তারা হলো এইসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। অদ্যাবধি তারাই ইহুদিদের টিকিয়ে রাখার জন্য সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। ইহুদিদেরকে যদি একটি দেহের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে তার মস্তিষ্ক হচ্ছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। কাজেই এই বৃহৎ শক্তিগুলোই হচ্ছে আমাদের বড় শত্রু। তাদের মুসাহেবি করে অথবা তাদের সাথে সখ্য বজায় রেখে ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে না- আমাদের অতীত ইতিহাস তারই সাক্ষী।

১৯৬৭ সালে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে গিয়ে মিশর চরম মার খেল, সিনাই ও গোলান উপত্যকা এ ক্ষুদ্র ইসরাইলী শক্তির হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। অনুরূপভাবে ১৯৭৭ সালে আবার ‘ক্যাম্প ডেভিড’ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তথা ইহুদিদের বড় দোসরের জন্য আরো স্থান করে দেয়া হলো। অথচ পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্যদেরকে তোমাদের বন্ধু বা অভিভাবক হিসাবে গণ্য করো না। এটা এজন্য যে, ‘আল-কুফরূ মিল্লাতুন ওয়াহেদাতুন’ অর্থাৎ সমগ্র কুফ্‌র বা খোদাদ্রোহী শক্তি মুসলমানদের মোকাবিলায় এক। এমতাবস্থায় এই কুফ্‌রি শক্তির মোকাবিলায় মুসলমানরা যদি একতাবদ্ধ হতে না পারে তা হলে তাদের এ বিড়ম্বিত ভাগ্যের পরিবর্তন অসম্ভব। আর এ কারণেই আজ মুসলিম মিল্লাতের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহর সমীপে আত্মনিবেদন করা, তাঁর ওপর নির্ভরশীল হওয়া। শিশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলা।

মুসলিম মিল্লাতকে একদেহে লীন না হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যা সমাধানের জন্য কোন বাস্তব কর্মপন্থা গ্রহণ সম্ভব নয়। আমাদের অতীত ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ‘ওয়াতাসিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়া’-এর শিক্ষা গ্রহণ করার ফলেই এই পৃথিবীতে আমরা একটি সোনালি অধ্যায় সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। আজও আমাদের সে অভিন্ন রূপটি ফুটিয়ে তোলা ব্যতীত মুক্তির কোন প্রত্যাশা করতে পারি না। আল্লামা ইকবালের ভাষায় বলব : ‘আমাদের লাভ ও ক্ষতি এক, আমাদের নবী এক, আমাদের দীন ও ঈমান এক, আমাদের কেবলা এক, আমাদের স্রষ্টা এক, আমাদের কিতাবও এক। কিন্তু আমরা মুসলমানরা যদি এক হতে পারতাম তবে কতই না উত্তম হতো!’

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের মুসলমানরা ইরানসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানদের ন্যায় পবিত্র মাহে রমযানের শেষ শুক্রবারকে ‘আল-কুদ্‌স দিবস’ হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। পবিত্র বাইতুল মোকাদ্দাসকে ইহুদিদের কবল থেকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ও সংগ্রামে এই দিবসটি সারা বিশ্বে উজ্জ্বল হয়ে উঠুক- আজকের দিনে এটাই হোক বাংলাদেশের তাওহিদী জনতা তথা বিশ্বমুসলিমের ঐকান্তিক কামনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.