শাহাজাদী

শাহাজাদী

বাংলা অনুবাদে: সোনিয়া শারমিন ও মো: মনিরুজ্জামান

হযরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) নিজের পিতার উপরে কান্নাকাটি করে শোকপ্রকাশ করা শুরু করে দিলেন। সকাল বেলায় তিনি কাঁদা শুরু করলেন, দুপুরবেলাও পিতা রাসুল (সাঃ)এর উপরে শোকপ্রকাশ করতেন ও কাঁদতে থাকতেন। বিকালবেলাতেও কান্নাকাটি করে শোকপ্রকাশ করতে লাগলেন।একদিন হযরত ফাতেমা (সাঃ আঃ)আপন ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, এমন সময় ইমাম আলী (আঃ)আসলেন ও বললেন, হে রাসুল (সাঃ)এর কন্যা মদিনা লোকজন আপনার উপর সালাম পাঠিয়েছেন আর বলেছেন, আপনি আপনার কান্নাকাটি করে শোকপ্রকাশ করার একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে নেন কেননা আপনার কান্নাকাটি করার কারনে মদিনাবাসীর লোকজনদের কাজে বিঘ্ন হচ্ছে। শাহাজাদী একথা শুনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন এবং বললেন, হে হাসানের পিতা মদিনার লোকজনকে বলে দাও যে, ওদের রাসুলের কন্যা ওদেরকে বেশি দিন আর বিরক্ত করবে না।এই উত্তরটা ছিল মদিনার লোকজনের জন্য কিন্তু আপনার কাছে আমার চাওয়া হলো আমার জন্য জান্নাতুল বাকীতে একটি হুজরা ঘর তৈরি করে দেন, যেখানে আমি আমার সন্তানদেরকে নিয়ে যেতে পারি এবং আমার বাবার উপরে শোকপ্রকাশ করতে পারি ও কাঁদতে পারি। ইমাম আলী (আঃ)নিজের হাতে জান্নাতুল বাকীতে হযরত ফাতেমা (সাঃ আঃ)ও তার সন্তানদের জন্য একটি ঘর তৈরি করে দিলেন। যার নাম “বায়তুল হুজুর”। নিজের সন্তানদেরকে নিয়ে প্রতিদিন ভোর বেলা অভ্যাসবসত শাহাজাদী সে হুজরাতে যেতেন। হাসান, হোসাইন, যায়নাব ও উম্মে কুলসুম সহ দুপুর পর্যন্ত নিজের পিতার উপরে শোকপ্রকাশ করতেন। দুপুরে আবার বাসায় এসে সন্তানদের খাবার খাওয়াতেন ও জরুরী সব কাজ সেরে এরপর আবার সন্তানদেরকে নিয়ে হুজরাতে যেতেন।..সন্ধ্যায় আবার বাসায় আসতেন এমন করতে করতে দিন যায় সপ্তাহ যায় মাস যায়। এরপর একদিন বিবি মা ফাতেমা (সাঃ আঃ)নিজের সন্তানদের সাথে ঘরে প্রবেশ করছিল আর আলী(আঃ) ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছিলেন এমন সময় আলী (আঃ)তার চেহারার দিকে এক নজর তাকালেন এবং বললেন হে রাসুলের কন্যা যেদিন হতে আপনার বাবার ইন্তেকাল হয়েছে সেই দিন থেকে আমি আপনার চেহারায় খুশি দেখিনি। আজ আপনার চেহারায় এই খুশির আলো কিসের। বিবি মা ফাতেমা(সাঃ আঃ)একথা শুনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন আবুল হাসান কি আর বলবো কাদতে কাদতে আমার চোখে ঘুম চলে আসে। আমার বাবা আমার স্বপ্নে আসে। এবং আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আর বলে মেয়ে আমার তোমার মুসিবতের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। আবুল হাসান আপনি আমার চেহারায় যে খুশি দেখতে পাচ্ছেন তা আমার বাবার সাথে মোলাকাত হওয়ার খুশি। এই কথা বলতে বলতে বিবি বললেন যে, এখন আমার ইচ্ছা এই যে, আজ আপনি আমার পাশে বসেন যাতে আমি ওসিয়ত করে যেতে পারি। আলী (আঃ)বাইরে যাচ্ছিলেন কিন্তু ফিরে এলেন। বিবি ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেন, আমার দুটি সন্তানকে দাসদের কাছে পাঠাও যাতে আমি আপনার কাছে কিছু ওসিয়ত করতে পারি। আর দুই ছেলেকে বললেন যাও নানার রওজা জিয়ারত করে আস। আর মেয়েরা গেলেন দাসির কাছে। আর হাসান হোসাইন গেলেন নানার রওজা জিয়ারত করতে।মা ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেন হাসানের বাবা দরজা বন্ধ করে দাও। আলী (আঃ) দরজা বন্ধ করলেন এবং এসে বিবির পাশে বসলেন। আলী( আঃ) বললেন এবার ওসিয়াত বলুন। শাহজাদী বলা শুরু করলেনঃআমার প্রথম হল: আবুল হাসান আমার খিদমতে যদি কোন এুটি হয়ে থাকে তাহলে কিয়ামতের দিন কোন অভিযোগ রাখবেন না, এখনি তা ক্ষমা করে দিন তখন আলী (আঃ)বললেন না না না বিবি আজ পর্যন্ত তোমার কোন এুটি হয় নি।আমার দ্বিতীয় ওসীয়ত হলো আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানেরা এতিম হয়ে যাবে। যদি ওদের দ্বারা কোন ভূল হয়ে যায়, আপনি ওদের সাথে বকা দিয়ে কথা বলবেন না। আলী (আঃ)কাঁপতে থাকলেন আর বললেন বিনতে রসুল তোমার সন্তানরা পুত পবিত্র। ওদের দ্বারা কোন এুটি হওয়ার সম্ভাবনার লেসমাত্র নেই।আমার তৃতীয় অসীয়াত এই যে, হাসানের বাবা আমার জানজা রাতে করো এবং আমার শত্রুরা যেন আমার জানাজায় না থাকে।আমার চতুর্থ ও শেষ ওসিয়াত: আমাকে মাটিতে রেখে আসার পর যেন আমাকে ভুলে যেও না এবং মাঝে মাঝে আমাকে সালামের জন্য আসতে থেকো। আলী (আঃ)ওসিয়াত কবুল করলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বললেন বিন্তে রসূল তোমার ওসিয়াত তো আমি কবুল করলাম। কিন্তু আমারও কিছু ওসিয়াত আছে সেটা তুমি কবুল করো।প্রথম ওসিয়াত হলো তোমাকে যখন বিয়ে করে আনি, তখন আমি দরিদ্র ছিলাম। তো আমি তোমার খিদমতের হক আদায় করতে পারিনি। তোমার বাবার কাছে যেয়ে আমার অভিযোগ করোনা।দ্বিতীয় ওসিয়াত এই যে, তোমার বাবাকে আমার সালাম পৌঁছে দিও্। আর তাকে বল তাঁর উম্মতেরা আমার সাথে কি করেছে।তৃতীয় ওসিয়াত হলো আমার মৃত্যুর পরও আমি সালামের জন্য আসবো। কিন্তু শর্ত হলো যখনই সালাম দিব, আপনি এখন যেভাবে জবাব দেন তখনও যেন সেভাবেই সালামের উত্তর দিবেন। বিবি ওসিয়ত কবুল করলেন।হযরত আলী ও ফাতেমা (আঃ)বসে একে অপরের প্রতি শোকাপ্রকাশ করছিলো। এমন সময় দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো শাহজাদী বললেন হাসানের বাবা দেখেন তো দরজায় কে আসলো?আলী (আঃ)বললেন, দরজায় কে এসেছেন? বাচ্চারা বললেন বাবা আমরা এসেছি। আলী(আঃ)দরজা খুললেন এবং দেখলেন হাসান হোসাইন (আঃ) দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। আলী(আঃ)বললেন আব্বু আমি তো আপনাদেরকে নানাজানের রওজা জিয়ারতের জন্য পাঠিয়েছিলাম এত তাড়াতাড়ি কিভাবে আসলে। তখন বাচ্চারা কেঁদে বললো যে, বাবা যখন আমরা নানার মাজারে গেলাম, তখন ইব্রাহিম খলিলুল্লাহর আওয়াজ আসলো। ইয়া রাসুলুল্লাহ ফাতেমা যাহরার এতিম এসেছে। তাহলে আব্বা আমার আম্মা কি দুনিয়া থেকে চলে গেছেন? ওনারা বলার সাথে সাথে কবুল হয়ে গেছে। আলী আর ফাতেমা ওসিয়াত করলো এবার আলী ঘরের থেকে বের হয়ে মসজিদে এসে বসে পড়লো।শাহজাদী দাসীকে বললেন, এখন আমি ঘরের দরজা বন্ধ করছি যতক্ষণ পর্যন্ত জিকিরে এলাহীর আওয়াজ আসবে ভাববে আমি বেঁচে আছি। যখন জিকিরে এলাহীর আওয়াজ বন্ধ হবে আলীকে খবর দিও। দাসী দরজায় বসে থাকলো। একসময় জিকিরে এলাহীর আওয়াজ বন্ধ হল।কানিজ দৌড়ে মসজিদে এলেন সাহস নেয় আলীকে কিছু বলার। নিজের মাথার চাদর খুলে আলী (আঃ)এর পায়ে দিলেন এবং বললেন মাওলা ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। আলী আসল, গোসল দিলেন কাফন পরালেন, জানাজা তৈরি করলেন। যখন জানাযা তৈরি হয়ে গেল এক পর্যায়ে আওয়াজ দিল ইয়া হাসান ইয়া হুসাইন ইয়া যায়নাব, ইয়া উম্মে কুলসুম।তখন ইমাম হাসান(আঃ)এর বয়স ছিল ৭ বছর, ইমাম হুসাইন (আঃ)এর বয়স ছিল ৬ বছর, যায়নাব (আঃ) এর বয়স ছিল সাড়ে চার বছর, উম্মে কুলসুম(আঃ) এর বয়স ছিল আড়াই বছর। আওয়াজ দিল হাসান নিজের মায়ের সাথে শেষবারের মতো দেখা করো, হুসাইন নিজের মায়ের কাছে শেষবারের মতো দেখা করো, যায়নাব নিজের মায়ের সাথে শেষবারের মতো দেখা করো, উম্মে কুলসুম নিজের মায়ের সাথে শেষবারের মতো দেখা করো।ঘরের দাসি বলল বাচ্চাদের মধ্যে দুজন দৌড়ে মায়ের কাছে আসলো, হাসান ও উম্মে কুলসুম আসলে। আর দুজন দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলো।হুসাইন দাঁড়িয়ে থাকলো। শাহজাদী জানালায় দাঁড়িয়ে থাকলো। আলী আওয়াজ দিলো বাচ্চারা তোমরা আসো। হুসাইন কেঁদে বললেন বাবা আমরা ততক্ষণ আসবো না যতক্ষণ মা আমাদেরকে ওইভাবে ডাকবে যেভাবে মরিয়ম ইসাকে ডেকেছিল। তখন মা ফাতেমার কাফনের কাপড় ছিড়ে গেল এক হাত দিয়ে হুসাইন (আঃ)কে ডাকলেন, আরাক হাত দিয়ে যায়নাবকে ডাকলেন। বাচ্চা দুজন এসে মায়ের বুকের উপর লুটিয়ে পড়লো। এক পর্যায়ে জিব্রাইল আওয়াজ দিল হে আলি বাচ্চাদেরকে তাদের মায়ের কাছ থেকে আলাদা করো। তা না হলে পুরো কায়ানাতে ভূমিকম্প শুরু হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.