বিবাহের সময় বিবি আয়েশার বয়স

বিবাহের সময় বিবি আয়েশার বয়স

 

অনলাইনেই হোক কিংবা অফলাইনে; ইসলামকে কালিমালিপ্ত করার জন্য ইসলামবিদ্বেষীরা সদা জাগ্রত ও সচেষ্ট রয়েছে। ইসলামের নবী (সা) কে অপবাদ দেওয়ার মাধ্যমে ইসলাম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে জনমানসে ইসলাম ও তার নবী (সা) এর ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করার অপপ্রয়াস সদা চালু রয়েছে। বলা বাহুল্য এইসব অপবাদ ও অভিযোগ গুলিতে তাদের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে প্রচলিত কতিপয় সহীহ আখ্যায়িত পুস্তক, যেগুলি আসলেই বহু বহু মিথ্যা ফুলঝুরিতে ভরা।

যাইহোক, নবী মহাম্মাদ (সা) কে এই অভিযোগটা প্রায়ই দেওয়া হয় যে তিনি মাত্র ছয়বছরের একটি মেয়েকে বিবাহ করেন, যখন তাঁর বয়স ছিল পঞ্চাশোর্ধ। যদিও এটাও বর্ণিত আছে যে ছয় বছর বয়সীকে বিবাহ করা সত্ত্বেও নয় বছর বয়সকালে সেই মেয়েটিকে ঘরে তোলা হয়। কিন্তু এই ঘটনা নীতিগত দিক দিয়ে বিবেকহীনতার পরিচায়ক। মেয়েটি হলেন হজরত আবুবকরের কন্যা, বিবি আয়েশা। আর অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জাজনক ঘটনা যে, এই রেওয়াতটি সহীহ বুখারী সহ বহু সুন্নি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এরকম অপবাদের সন্তোষজনক কোন জবাব না থাকাই বাধ্য হয়ে ইসলামবিদ্বেষীদের এইভাবেই বোঝাতে হয় যে, আরবের মরুভূমির পরিবেশে এই বয়সের মেয়েরা ম্যাচিউরড হয়ে ওঠে। আর প্রাচীনযুগে এই বয়সের মেয়েদেরকেও বিয়ে করতে দেখা গেছে। বাইবেলে অনেক নবীকে এর চেয়েও কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে করার কথা উল্লেখিত আছে। কিন্তু এইভাবে মূল বিশয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। মহানবী (সা) কী এইরূপ শিশু বয়সের একজন মেয়েকে বিবাহ করতে পারেন অথবা তাঁর সাথে বিবাহের সময় বিবি আয়েশার প্রকৃত বয়স কত ছিল সে বিষয়টি ধামাচাপাই থেকে যায়। প্রকৃত সত্য হল, সুন্নি ঐতিহাসিক আর হাদিস গ্রন্থগুলি থেকে এমন কোন দলীল বা ইঙ্গিত পাওয়া যায় না যা থেকে প্রমাণিত হয় যে রাসুলেকরিম (সা) এর সাথে বিবাহের সময় বিবি আয়েশার বয়স ছয় অথবা নয় বছর ছিল; বরং এরূপ বহূ দলীল বা ইঙ্গিত মেলে যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিবাহের সময় বিবি আয়েশার বয়স ছয় অথবা নয় বছর ছিল না, তার চেয়ে অনেক বেশী ছিল। নিম্নে এরূপ কয়েকটি (সুন্নিসূত্রে বর্ণিত) দলীল/ইঙ্গিত প্রদান করা হল যা থেকে খুব সহজেই মহানবী (সা) কে এই অপবাদ থেকে মুক্ত করা যায়-

  1. বহু হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত আছে বিবাহের সময় বিবি আয়েশার বয়স ছিল ছয় এবং নয় বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত তিনি স্বামীর ঘরে যাননি। কিন্তু এইসম্বন্ধীয় হাদিসগুলির অধিকাংশই বর্ণিত হয়েছে হাশিম বিন উরওয়াহ থেকে। হাশিম বিন উরওয়াহ যখন মদিনাতে শিক্ষতা করতেন, তখন তিনি এই হাদিস বর্ণনা করেন নি, বরং সত্তরোর্ধ বয়সে তিনি যখন ইরাকে হিজরত করেন, তখন তিনি এরূপ হাদিস বর্ণনা করেন। আর তাঁর সেই বয়সে বর্ণিত হাদিসগুলি সম্পর্কে তাঁরই ছাত্র মালিক ইবনে আনাসের অভিমত, এই হাদিসগুলি অবিশ্বস্ত ও অনির্ভরযোগ্য হিসাবে পরিত্যাজ্য।
  2. সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, বিবি আয়েশা সম্পর্কে বলা হয় যে তিনি বদরের যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করেন। যেহেতু পনেরো বছরের নীচে কাওকে যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রণের অনুমতি দেওয়া হত না তাই বলা যায় বদরের যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল কমপক্ষে 15 বছর। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় 624 অব্দে। সুতরাং সেই অনুযায়ী 622 অব্দে তাঁর বিবাহের বছরে তাঁর বয়স হওয়া উচিৎ 13 বছর।
  3. ইবনে ইসহাকের ‘সিরাত রাসুলুল্লাহতে’ ইবনে হিশামের টিপ্পনীতে লিপিবদ্ধ, “বিবি আয়েশা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাবেরও পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার সময় নিশ্চয় তাকে চলতে পারা এবং বলতে পারা- বয়সের এমন স্টেজে উত্তীর্ণ হতে হয়েছে। এই স্টেজকে যদি আমরা সর্বনিম্ন তিনবছরও ধরি, তাহলে ইসলাম গ্রহণের সময় বিবি আয়েশার বয়স দাঁড়ায় তিনবছর। আর যেহেতু তিনি হজরত ওমর ইবনে খাত্তাবের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাই, আয়েশাকে ইসলাম গ্রহণ করতে হয়েছে ইসলামের প্রারম্ভিক বছরে অর্থাৎ খ্রীস্টিয় 610 অব্দে বা তার কাছাকাছি সময়ে। এবার, 610 অব্দে আয়েশার বয়স তিন ধরে গণনা করলে 622 অব্দে বিবাহের বছরে বিবি আয়েশার বয়স দাঁড়ায় 15 বছর।
  4. তাবারী বর্ণনা করেছেন যে ইথিওপিয়া সফরের সময় (615 অব্দ) হজরত আবুবকর আয়েশাকে সফরের ক্লান্তি থেকে মুক্ত রাখার জন্য বিবাহ দিয়ে দেওয়ার মনস্থির করেন এবং সেইমতো তিনি মুতা’মের নিকট তাঁর ছেলের সাথে আয়েশার বিবাহের প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু মুতা’ম এই প্রস্তাবকে এইজন্য প্রত্যাখ্যান করেন কারণ আবুবকর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং 615 অব্দে আয়েশা যদি বিবাহের উপযুক্ত বয়সে হয়ে থাকেন তাহলে 622 অব্দে তাঁর বিবাহের বছরে আয়েশার বয়স নিঃসন্দেহে নয় বছরের বেশী হওয়া উচিৎ।
  5. তাবারী আরও বর্ণনা করেছেন যে হজরত আবুবকরের চার সন্তানই জন্মগ্রহণ করে জাহেলিয়াতের যুগে। জাহেলিয়াতের যুগ অর্থাৎ প্রাক-ইসলামিক যুগ, যা শেষ হয় ইসলাম প্রচারের বছরে (610 অব্দে)। সুতরাং এই অনুযায়ী আয়েশার জন্ম যদি 610 অব্দেওও ধরে নিই, তাহলে 622 অব্দে তাঁর বিবাহের বর্ষে বয়স দাঁড়ায় 12 বছর।
  6. ইবনে হাজারে বর্ণনামতে, বিবি ফাতেমা, বিবি আয়েশার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। ফাতিমার জন্ম সম্পর্কে বলা হয়েছে যে যখন মহানবী (সা) বয়স 35 বছর তখন তাঁর জন্ম। এই গণনা অনুসারে বিবাহের সময় (622 অব্দ) আয়েশার বয়স 12 হওয়া বাঞ্চনীয়।
  7. প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে আয়েশার জন্ম হয়েছিল হিজরতের আটবছর পূর্বে। বুখারীতে (কিতাব আল-তাফসীর) আয়েশা হতে বর্ণিত, পবিত্র কুরয়ানের 54 নং সূরা, সূরা আল-ক্বামার নাযিল হওয়ার সময় তিনি ছিলেন জারিয়া (বালিকা) বয়সের। সূরা আল-ক্বামার নাযিল হয় হিজরতের নয় বছর আগে। উক্ত বর্ণনামতে বিবি আয়েশা সূরা আল-ক্বামার নাযিলের সময় (হিজরতের 9 বছর পূর্বে) ছিলেন একজন জারিয়া। জারিয়া বলা হয় 7-14 বছরের মেয়েদেরকে। সুতরাং এই অনুযায়ী বিবি আয়েশার বিবাহের সময় বয়স দাঁড়ায় 14-21 বছর।
  8. প্রখ্যাত সুন্নি ইমাম, আহমাদ ইবনে হাম্বাল তাঁর মুসনাদে লিপিবদ্ধ করেছেন, বিবি খাদিজার (রা) মৃত্যুর পর জনাবে খাওলা, নবী (সা) এর নিকট আসেন এবং তাঁকে পুনরায় একটি বিবাহ করা পরামর্শ দেন। বিবাহের প্রস্তাব হিসাবে তিনি দুটি অপশন দেন- হয় কোন কুমারী মেয়েকে (bikr) অথবা কোন বিবাহ সম্পন্না নারীকে (thayyib) বিবাহ করার পরামর্শ দেন। কুমারী মেয়ে (bikr) হিসাবে তিনি বিবি আয়েশার নাম উল্লেখ করেন। আরবীতে বিকর বলতে একজন ম্যাচিউরড মেয়েকে বোঝায়, কোন 9 বছরের ইম্যাচিউরড মেয়েকে নয়। যদি সেই সময় আয়েশা 9 বছরের হতেন তাহলে জনাবে খাওলা তাঁকে জারিয়াহ বলে সম্বোধন করতেন, বিকর হিসাবে নয়।
  9. বুখারীর হাদিস মতে বিবি আয়েশা বদর ও ওহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বুখারীতে (কিতাবুক মাগাজী) এটাও উল্লেখিত আছে, ইবনে ওমর হতে বর্ণিত, “মহানবী (সা) আমাকে ওহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দেননি কারণ আমি তখন ছিলাম 14 বছরের। কিন্তু তিনি আমাকে খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দেন, যখন আমার বয়স ছিল 15 বছর।” সুতরাং যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রণের সর্বনিম্ন বয়সসীমা পনেরো বছর ধরলে ঐ যুদ্ধগুলির সময় বিবি আয়েশা কম্পক্ষে 15 বছরের ছিলেন। সেই হিসাবে বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছিক 13 অথবা 14 বছর।
  10. প্রায় সকল ঐতিহাসিকদের ঐক্যমতে আয়েশার বড় বোন আসমা তাঁর চেয়ে দশ বছরের বড়। আসমা সম্পর্কে বলা হয় যে তিনি হিজরী 73 সনে যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স ছিল 100 বছর। সুতরাং হিজরী 73 সনে আসমা যদি 100 বছর বয়সী হয়ে থাকে তাহলে হিজরতের সময় তাঁর বয়স হওয়া উচিৎ 27-28 বছর। অর্থাৎ হিজরতের বর্ষে বিবি আয়েশার বয়স হওয়া উচিৎ 17-18 বছর। আয়েশার বিবাহ যদি প্রথম অথবা দ্বিতীয় হিজরীতে হয়ে থাকে (যেমনটি বর্ণিত আছে), তাহলে বিবাহের সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় 18-20 বছর।

পরিশেষে এটাই বলব, কিছু প্রচলিত অনৈতিক, ভিত্তিহীন, মনগড়া, বানোয়াট, মিথ্যা আর জাল হাদিসকে হাতিয়ার করে ইসলামবিদ্বেষীরা ইসলামের শ্রেষ্ঠ নবী (সা) কে অবমাননা আর অপবাদের শিকারে পরিণত করেছে। তাদের যথার্থ বিচার মহান আল্লাহর দরবারে কামনা করছি। আর সেইসঙ্গে নবী মুহাম্মাদ (সা) এর অনুসারী সকল মুসলিম সমাজকে তাঁর সম্মান, মর্যাদা রক্ষার্থে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আসুন, যেসব পুস্তকে তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা কথা ছাপা আছে (তা যত বড় সহীহই হোক না কেন), সেগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলাম ও বিশ্বনবী (সা) এর মান, মর্যাদা, গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রাখি।

আল্লাহুম্মা সাল্লি আ’লা মুহাম্মাদিঁও ওয়া আ-লে মুহাম্মাদ ওয়া আজ্জ্বিল ফারাজাহুম।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.