যাকাতে ফিতরা

যাকাতে ফিতরা

নবীজীর সুন্নত এক সা’ (৩ কেজি)
আর মু’আবিয়ার সুন্নত অর্ধ সা’ (১ কেজি ৫০০ গ্রাম)

এবার আপনি কার সুন্নত মেনে চলবেন নবীজীর নাকি মু’আবিয়ার?

গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ২৪/ যাকাত (كتاب الزكاة)
হাদিস নম্বরঃ ১৫০৪

২৪/৭১. মুসলিমদের গোলাম ও আমাদের উপর সদাকাতুল ফিতর প্রযোজ্য।

১৫০৪ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, মুসলিমদের প্রত্যেক আযাদ, গোলাম পুরুষ ও নারীর পক্ষ হতে সদাকাতুল ফিতরা হিসেবে খেজুর অথবা যব-এর এক সা‘ পরিমাণ [৩ কেজি] আদায় করা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরজ করেছেন। (১৫০৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪০৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৪১৩)

[1] সকল প্রকার খাদ্যদ্রব্য থেকে এক সা‘ পরিমাণ (৩ কেজি) ফিতরা দিতে হবে। এটাই বিভিন্ন সহীহ হাদীসের দাবী এবং নাবী (সাঃ) ও ৪ খলীফাহর যুগের বাস্তব আমল। 
মু‘আবিয়া (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে যখন আসলেন এবং সেখানে গম আমদানী হল তখন তিনি বললেন, আমার মতে গমের এক মুদ (অন্য বস্তুর) দু’ মুদের সমান। তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে। 
فعدل الناس إلى نصف صاع من بر অর্থাৎ লোকেরা গমের অর্ধ সা‘ এর সাথে অন্য বস্তুর এক সা‘ এর সমান হিসাব করলেন। অতএব বুঝা গেল এক সা‘ (৩ কেজি) খেজুর, কিসমিস, পনির, যব এবং অন্য খাদ্য দ্রব্যের যে মূল্য ছিল সে পরিমাণ মূল্য ছিল অর্ধ সা‘ (১,৫০০) গমের।

সে কারণে মু‘আবিয়া (রাঃ) অর্ধ সা‘ (১কেজি ৫০০ গ্রাম) ফিতরাহ আদায়ের ফাতাওয়া দিলেন। 
কিন্তু সহাবীদের অধিকাংশই তাঁর প্রতিবাদ করেছেন। 
যেমন আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বললেনঃ
فأما أنا فلا أزال أخرجه كما كنت أخرجه أبدا ما عشت رواه مسلم
আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন সর্বদা ঐভাবেই ফিতরা আদায় করব যেভাবে আগে আদায় করতাম। (মুসলিম ১ম খন্ড ৩১৮ পৃষ্ঠা) 
ইমাম হাকিম ও ইবনু খুজাইমাহ সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, عن عياض بن عبد الله بن سعد بن أبي سريح قال : قال أبو سعيد و ذكر عنده صدقة الفطر فقال : لا أخرج إلا ما كنت أخرجه على عهد رسول الله صلى الله عليه و سلم صاعا من تمر أو صاعا من حنطة أو صاعا من شعير أو صاعا من إقط فقال له رجل من القوم : أو مدين من قمح فقال : لا تلك قيمة معاوية لا أقبلها و لا أعمل بها ‘আইয়ায বিন ‘আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, তার নিকট রমাযানের সদাকাহ সম্পর্কে বর্ণনা করা হলে তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যামানায় যে পরিমাণ সদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম তা ব্যতীত অন্যভাবে বের করব না। 
এক সা‘ (৩ কেজি) খেজুর, এক সা‘ (৩ কেজি) গম, এক সা‘ (৩ কেজি) যব ও এক সা‘ (৩ কেজি) পনির।

কোন এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, গমের দু’ মুদ দ্বারা কি আদায় হবে না? তিনি বললেন, না। এটা মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর মনগড়া নির্ধারিত। আমি সেটা গ্রহণও করব না বাস্তবায়নও করব না। (ফাতহুল বারী ৩য় খন্ড ৪৩৭ পৃষ্ঠা)

ইমাম নাববী (রহঃ) বলেন, যারা মু‘আবিয়ার কথা মত গমের দু’ মুদ আদায় করাকে গ্রহণ করেছে তাতে ত্রুটি রয়েছে। কেননা এ ব্যাপারে সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) এবং অন্যান্য সাহাবাগণ বিরোধিতা করেছেন যাঁরা দীর্ঘ সময় নাবী (সাঃ) এর সাথে ছিলেন এবং তাঁরা নাবী (সাঃ) এর অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবগত ছিলেন। মু‘আবিয়া (রাঃ) নিজের রায় দ্বারা মত ব্যক্ত করেছেন। তিনি নবী (সাঃ) হতে শুনে বলেননি। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর হাদীসে ইত্তিবাহ ও সুন্নাত গ্রহণের প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। (ফাতহুল বারী ৩য় খন্ড ৪৩৮ পৃষ্ঠা, মুসলিম শরহে নাববী ১ম খন্ড ৩১৭-৩১৮ পৃষ্ঠা, শরহুল মুহাযযাব ইমাম নাববী) 
ইমাম শাফিয়ী, আহমাদ, ইসহাক এক সা‘ (৩ কেজি) ফিতরায় হাদীস প্রমাণ পেশ করেন। কেননা নবী (সাঃ) সদাকাতুল ফিতর খাদ্যদ্রব্যের এক সা‘ (৩ কেজি) আদায় করা ফরয করেছেন। আর গম হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যেরই একটি। অতএব এক সা‘ ব্যতীত ফিতরা আদায় বৈধ হবে না। আর আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ), আবুল আলিয়া, আবুশ শা’সআ, হাসান বাসরী, জাবির বিন যায়িদ, ইমাম শাফিয়ী, ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও ইসহাক (রহ.) প্রমুখ এ দলীল গ্রহণ করেছেন। নাইলুল আওতারে এভাবেই রয়েছে। তাতে আরো রয়েছে গম ও অন্য খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে পার্থক্য করা যাবে না। আর যারা অর্ধ সা‘ গমের কথা যে হাদীসগুলির দ্বারা বলে তা সম্পূর্ণ যঈফ।
(তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৩য় খন্ড, ২৮০-২৮১ পৃষ্ঠা) 
এ বিষয়ে সকল হাদীস পর্যালোচনা করে দেখা যায় মু‘আবিয়া (রাঃ) যখন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, হাজ্জ মৌসুমে হাজ্জ করে যখন লোকদের সাথে কথা বললেন তখন জানতে পারলেন শাম বা সিরিয়ার এক মুদ গমের যে দাম হিজাযের দু’ মুদ খেজুর, কিসমিস ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের একই দাম অথবা যখন হিজাযে গম আমদানী হল তখন দেখা গেল এক সা‘ খেজুর বা কিসমিসের মূল্য অর্ধ সা‘ গমের মূল্যের সমান। তাই মু‘আবিয়া (রাঃ) দামের দিক দিয়ে সমান করে দুই মুদ বা অর্ধ সা‘ গম আদায়ের কথা বলেন এবং সাহাবাদের প্রতিবাদের মুখে পড়েন। বর্তমানে যদি কেউ মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর কথা মানতে চায় তাহলে তার কথাকে বর্তমান সময়ের দ্রব্যমূল্যের সাথে তুলনা করে মানতে হবে। মাক্কাহ মাদীনার পরিমাপ হিসাবে এক সা‘-এর ওজন হয় বর্তমানে দুই কেজি একশত বাহা গ্রাম। যদি নিম্ন মানের খেজুরের দাম ধরা হয় তাহলে ৩০ টাকা দরে প্রায় ৩ কেজি খেজুরের মূল্য আসে ৬৫ টাকা। 
যেহেতু মু‘আবিয়া -এর সময় খেজুরের তুলনায় গমের দাম বেশী ছিল তাই অর্ধ সা‘ আদায় করার কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু বর্তমানে গমের দ্বারা ফিতরা আদায় করতে হলে ৬৫ টাকার গম দিতে হবে। বর্তমানে প্রতি কেজি গমের মূল্য ১০ টাকা ধরলে মাথাপিছু সাড়ে ছয় কেজি গম দিতে ফিতরা আদায় করতে হবে। নচেৎ নাবী (সাঃ) যে এক সা‘র (প্রায় ৩কেজির সমান) কথা বলেছেন সেই পরিমাণ আপন আপন খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আদায় করতে হবে। রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যামানায় দীনার, দিরহাম ইত্যাদি মুদ্রা চালু ছিল। কিন্তু দীনার দিরহামের দ্বারা অর্থাৎ আমাদের যামানায় প্রচলিত টাকা পয়সার দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করার প্রমাণ কোন হাদীসেই পাওয়া যায় না। তাঁরা তাঁদের খাদ্যবস্তু দিয়েই ফিতরা আদায় করতেন। আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর এ ব্যবস্থাপনায় বহুবিধ কল্যাণ নিহিত আছে। ফিতরাহ দানকারী যখন ফিতরার খাদ্যবস্তু কিনে তখন বিক্রেতা উপকৃত হয়। ফিতরাহ গ্রহণকারী খাদ্যবস্তু বিক্রি করে দিলে ফিতরাহ গ্রহণ করে না এমন সব গরীব ক্রেতা উপকৃত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.