রোযা : আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সোপান

আব্দুল কুদ্দুস বাদশা

সূচনা
জগৎ ও কালের স্রষ্টা মহান আল্লাহ। স্বভাবতই স্থান-কালের ঊর্ধ্বে তিনি। তবে একত্ববাদী সংস্কৃতিতে কোন কোন স্থান ও কালের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রমজান মাস তেমনই একটি মাস, যা ‘শাহরুল্লাহ’ বা আল্লাহর মাস নামে প্রসিদ্ধ। এ মাসের এমন কিছু বিশেষত্ব ও গুণ রয়েছে যা অন্য কোন সময়ের নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, এ মাসের প্রতিটি ঘণ্টা, মিনিট ও মুহূর্তই অন্য যে কোন মুহূর্তের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
চারটি রোকন নিয়ে রমজান মাস। প্রথমত বস্তুগত আহার্য থেকে বিরত হওয়া এবং আধ্যাত্মিক খোরাকের যোগান নেওয়া। মাওলানা জালাল উদ্দিন রূমির ভাষায় : ‘একটি মুখ বন্ধ, খুলে গেছে আরেকটি মুখ/ যা আহার করে যত গুপ্তরহস্য সুখ’। দ্বিতীয়ত শবে কদর যা ইসলামী আধ্যাত্মিকতার পরম শুভ রাত। তৃতীয়ত মুত্তাকীদের ইমাম হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের শাহাদাত, যিনি ছিলেন সমস্ত পুণ্যময় মানবিক গুণের শ্রেষ্ঠ সমাহার। আর চতুর্থত পবিত্র কোরআনের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ ও হেদায়াত প্রাপ্তি। একজন মুসলমান যখন পবিত্র রমজান মাসকে এই চারটি মূল আচারানুষ্ঠান সহকারে পালন করতে সক্ষম হয় কেবল তখনই তার জন্য সার্থক হয়ে ওঠে ঈদুল ফিতরের প্রসন্নতা।
রমজান মাস হচ্ছে ইসলামের অন্তর্নিহিত সারসত্যের প্রকাশস্থল। অর্থাৎ মহান আল্লাহর সম্মুখে নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণ। এ অবসরে বান্দাগণ স্বীয় প্রতিপালকের নির্দেশ পালনে ও তাঁর সন্তুষ্টিকল্পে, এমনকি নিজের প্রাকৃতিক ও অনুমোদিত চাহিদাগুলোকেও উপেক্ষা করে থাকে এবং মহান ¯্রষ্টার পানে বন্দেগির শির অবনত করে। দীর্ঘ এক মাস যাবৎ বন্দেগির এই বিশুদ্ধ অনুশীলন মানুষকে সংকীর্ণ নাফসানীর দেওয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসার আত্মিক শক্তির যোগান দেয়। এ শক্তি সংযমশীলতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি। কোরআনের পরিভাষায় ‘তাকওয়া’।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত ‘খুতবা-এ শাবানিয়্যাহ’র মেেধ্য রমজান মাসের আগমন উপলক্ষে বলেন :
أيّها النّاس قد أقبل إليكم شهر الله بالبركة والرّحمة والمغفرةৃ
-‘হে লোকসকল! তোমাদের দিকে এগিয়ে আসছে আল্লাহর মাস- মঙ্গল, অনুগ্রহ এবং ক্ষমার বারতা নিয়ে…।’ অথচ পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে, আজ আমাদের দেশে মুসলমানদের কাছে রমজান আসে আতঙ্কের বারতা নিয়ে। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির আতঙ্ক। যে জিনিসগুলো রোযাদারের যত বেশি প্রয়োজন হয়, সেগুলোর মূল্যই তত বেশি চড়ে যায়। একারণে অধিকাংশ মুসলিম পরিবারের কাছে রমজান মাস ভীতি ও উৎকণ্ঠার। যে রমজান ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সৌরভ ছড়িয়ে দিতে পারতো তা যেন আজ পরিণত হয়েছে অস্বস্তিকর মাসে। যে অস্বস্তি ফুটে ওঠে মুমিনের মুখম-লের মলিনতা ও বিষণœতার কালো ছায়া হয়ে। কতিপয় দুনিয়াপূজারি মানবতাবিবর্জিত লোকের অসৎ কামনা-বাসনার কবজায় এভাবে বন্দি হয়ে পড়েছে মুসলমান জাতির সবচেয়ে বড় আত্ম-সাধনার মাসটি। আরো পরিহাসের বিষয়টি হলো এভাবে অসাধু উপায়ে কাড়ি কাড়ি টাকা যারা ঘরে তোলে তারাই আবার সেই টাকার কিয়দংশ ‘ইফতারি’র নামে যিয়াফত আয়োজনে খরচ করে। আর সেখানে আমন্ত্রিত হয় তার মতোই আরো কিছু পেটপূজক। এসব দুনিয়াবাদী লোকের কাছে রমজান মাস অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাই এক রমজান অতিবাহিত না হতেই তারা দিন গুণতে থাকে কবে আবার আসবে মাহে রমজান যাতে পুনর্বার তারা মুসলমানদের মুখের গ্রাস নিয়ে নির্মম নিষ্ঠুর দুরাচারে মেতে উঠতে পারে এবং আখেরাতকে দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রয় করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে রমজানের আসল তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই মানুষ এ ধরনের আচরণ করে থাকে।
রোযার আধ্যাত্মিক মর্যাদা
রোযা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : لِكُلِّ شَيْءٍ بَابٌ وَ بَابُ العِبَادَةِ الصَّوم – ‘সব জিনিসের একটি দরজা থাকে। আর ইবাদতের প্রবেশদ্বার হচ্ছে রোযা।’  যতক্ষণ কোন ব্যক্তি রোযাদারিতে প্রবেশ না করবে ততক্ষণ সে ইবাদতের অবস্থায় প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ, ইবাদতের জগৎ বিশেষ এক স্বতন্ত্র জগৎÑ যা চিন্তা বা অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। উপরিউক্ত হাদীসের মর্মার্থ হচ্ছে যে, আমরা ভরা পেটে ইবাদতের বাগিচায় প্রবেশ করতে পারব না। মানুষের মাঝে যখন ইবাদতের অবস্থা সৃষ্টি হয় তখন সে অনুভব করবে যে, তার অবস্থান অস্তিত্বজগতের কেন্দ্রে। সকল লোভ-লালসা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তার চিত্ত থেকে অপসারিত। ফলে তার যে আসল অবস্থান অর্থাৎ আল্লাহর বন্দেগি, সেখানে সে প্রত্যাবর্তন করে। সুতরাং মনে রাখতে হবে যে, রোযা হচ্ছে ইবাদতের জগতে প্রবেশের মাধ্যম। এই রোযার পথ ধরেই আমাদের অপরাপর ইবাদাতের মধ্যে রূহ সঞ্চারিত হয় এবং প্রাণ লাভ করে।
আল্লাহর যিয়াফত!
একই খুতবায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : و هو شهر دعيتم فيه الى ضيافة الله -‘এ মাসে তোমরা আল্লাহর যিয়াফতে আমন্ত্রিত হয়েছ।’ ‘যিয়াফাতুল্লাহ’ কথার অর্থ আল্লাহ মেজবান, আর বান্দারা তার মেহমান। মেজবান যত ধনাঢ্য হয় তার আপ্যায়নও তত রকমারি হয়। এদিক থেকে দেখলে আল্লাহর যিয়াফতে উপস্থিত হওয়ায় প্রত্যেক বান্দার উচ্ছ্বসিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাঁর যিয়াফতে মেহমানদের কী দ্বারা আপ্যায়ন করবেন? রেওয়ায়াতে বর্ণিত যে, কোন এক নবীর সময়ে তিনজন ঈমানদার ব্যক্তি একটি সফরে বের হয়। পথিমধ্যে রাত হয়ে আসায় তারা একটি স্থানে রাত্রি যাপনে বাধ্য হয়। কিন্তু আশ্রয়ের জন্য না কোন ভালো জায়গা তারা খুঁজে পেল, আর না ভালো কোন খাবারের জোগাড় করা সম্ভব হলো। অবশেষে তাদের মধ্যে একজন বলল : ‘ঐ গ্রামে আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাস করে। আমি সেখানেই চললাম। হয়তো রাত কাটানোর একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’ একথা শুনে অন্য একজনের স্মরণে আসল যে, এই এলাকায় তার এক পুরাতন সহকর্র্মী বাস করতো। তৎক্ষণাত সে বলে উঠল : ‘আমিও চললাম। যদি আমার ঐ সহকর্মীর ঠিকানা বের করতে পারি তাহলে তার বাড়িতেই মেহমান হতে পারব।’ কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তিটি অনেক ভেবেও এমন কারো হদিস করতে পারলো না যার বাড়িতে সে মেহমান হতে পারে। অগত্যা বলল : ‘আমি আর কোথায় যাব। দেখি, ধারে-কাছে কোন মসজিদ খুঁজে পাই কিনা! রাতটা সেখানেই কাটিয়ে দেব।’ পরের দিন সকালে সফর অব্যাহত রাখার জন্য পুনরায় যখন তারা একত্র হলো তখন ঐ দুজন রাত্রে কী কী মজার খাবার খেয়েছিল এবং কেমন নরম বিছানায় আরামে ঘুমাতে পেরেছিল তা নিয়ে গর্ব করছিল। আর বন্ধুদের মেহমানদারির ভুয়ষী প্রশংসা করছিল। কিন্তু তৃতীয় লোকটি বলল : ‘আসলে আমার তো কেউ ছিল না। তাই আল্লাহর মেহমান হয়েছিলাম এবং তাঁরই ঘরে রাত্রিযাপন করেছিলাম। যদিও সারাটা রাত ক্ষুধায় কাটাতে হয়েছে।’ সাথে সাথে তৎকালীন নবীর কাছে গায়েবী সংবাদ আসল : ‘যাও, ঐ ঈমানদার লোকটিকে বল, সত্যিকার অর্থে আমি (আল্লাহ) তোমাকে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করেছি এবং মেহমানদারিও করেছি। কিন্তু ‘ক্ষুধা’র চেয়ে উৎকৃষ্ট কোন আহার পাইনি যা দ্বারা তোমাকে আপ্যায়ন করতে পারি।’
কি আছে ক্ষুধায়?
মহান আল্লাহ বলেন :  وَ لَنَبْلُوَنَّکُمْ بِشَیْ‏ءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَ الْجُوعِ…. –‘আমরা অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা… দ্বারা…।’  একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন : ان الشیطان لیجری من ابن آدم مجری الدم فضیقوا مجاریه بالجوع – ‘নিশ্চয় শয়তান আদম সন্তানের রক্ত চলাচলের পথ দ্বারা চলাচল করে। কাজেই তার পথকে সংকীর্ণ করে দাও ক্ষুধার দ্বারা।’  অপর এক হাদীসে এসেছে : ‘ভরা পেট হচ্ছে শয়তানের চারণভূমি।’ শয়তানের নাগাল থেকে মুক্তি পাওয়া সকল বান্দার কাম্য। তাইতো একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীবর্গের উদ্দেশে বললেন : الا اخبركم بشیء ان انتم فعلتموه تباعد الشیطان منكم كما تباعد المشرق من المغرب ঃ ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি জিনিসের সংবাদ দিব না যা তোমরা যদি পালন কর তাহলে শয়তান তোমাদের থেকে দূরে সরে যাবে যেমনভাবে পূর্ব দূরে সরে থাকে পশ্চিম থেকে।’ সাহাবীবর্গ আগ্রহের সাথে উত্তর দিলেন : ‘জি, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)!’ তিনি বললেন : اَلصَّومُ يُسَوِّدُ وَجْهَهُ -‘রোযা শয়তানের মুখকে কালিমালিপ্ত করে দেয় (অর্থাৎ তোমাদের থেকে তাকে ঐরূপ দূরে তাড়িয়ে দেয়)।’  আর খুতবা-এ শা’বানিয়ার মধ্যে তিনি বলেছেন : وَالشَّياطِينَ مَغْلُولَةٌ فَاسْألُوا رَبَّكُمْ اَنْ لا يُسَلِّطَها عَلَيْكُم ‘…এ মাসে শয়তান শিকলে বাঁধা পড়ে। কাজেই প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করো যেন তিনি তাকে তোমাদের ওপর কর্তৃত্ববান না করে দেন।’ তাই এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপদেশ হচ্ছে : حَيُّوا قُلُوبَكُم بِقِلَّةِ الضِّحْكِ وَ طَهِّرواها بِالجُوعِ، تَصْفُو وَ تَرِقْ – ‘তোমাদের অন্তরসমূহকে জীবিত করো কম হাসির মাধ্যমে। আর সেগুলোকে পবিত্র করো ক্ষুধার মাধ্যমে যাতে স্বচ্ছ ও কোমল হয়ে ওঠে।’
মহানবী (সা.) বলেছেন : مَا مَلَأُ آدَميُّ وِعَاءً شَرّاً مِنْ بَطْنِه – ‘মানুষের জন্য ভরা পেটের চেয়ে ক্ষতিকর ও অকল্যাণকর আর কিছু নেই।’  কারণ, তা রূহকে সুস্থ অবস্থা থেকে ব্যধিগ্রস্তের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে মানুষ তার কল্যাণের পথ হারিয়ে ফেলে। আসলে যখন ঈমানের আলো অন্তঃকরণের ওপর কিরণ নিক্ষেপ করে এবং মানুষ ঈমানের উষ্ণতা থেকে উত্তাপ গ্রহণ করে তখন সে আর উদরপূর্তি করে ভক্ষণ করার মধ্যে মজা খুঁজতে যায় না। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপদেশ : اَدِيمُوا قَرْعَ بابِ الْجَنَّةِ يَفْتَحْ لَكُمْ – ‘অবিরাম বেহেশতের দরজায় কড়া নাড়তে থাক যতক্ষণ না তা তোমাদের জন্য খুলে যায়। (রাবী বলেন 🙂 قُلْتُ: وَ كَيْفَ نُديمُ قَرْعَ بابِ الْجَنَّة؟ – আমি বললাম : ‘কীভাবে আমরা বেহেশতের দরজায় কড়া নাড়ব?’ মহানবী বললেন : قالَ: بِالْجُوعِ وَ الظَّمَإِ – ‘ক্ষুধা ও পিপাসার মাধ্যমে।’  তাইতো খুতবায়ে শা’বানয়িার মধ্যে তিনি বলেছেন : اِنَّ اَبْوابَ الْجِنانِ في هَذا الشَّهْرِ مُفَتَّحَةٌ، فَاسْألُوا رَبَّكُم اَنْ لا يُغَلِّقَها عَلَيْكُم ‘…আর এ মাসে বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে যায়। কাজেই প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করো যেন তোমাদের ওপর তা বন্ধ না করে দেন।…’
রেওয়ায়াতে রয়েছে : اِنَّ اَبْغَضَ النَّاسِ اِلَي‌الله تَعالي اَلْمُتَّخِمُونَ – আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণ্য লোক তারা, যারা উদর পুরে ভক্ষণ করে তিতা (ঢেকুর) অবধি।
হযরত লোকমান স্বীয় পুত্রকে নসিহত করে বলেন : يا بُنَيَّ اِذَا اِمْتَلَأتِ‌الْمِعْدَةُ، نامَتِ الفِكْرَةُ وَ خَرَسَتِ الْحِكْمَةُ وَ قَعَدَتِ الاَعْضاءُ عـنِ العِبادَةِ – ‘পুত্র আমার! যখন তোমার উদর পূর্ণ হয়ে যাবে তখন তোমার চিন্তা নিদ্রাগমন করবে, তোমার প্রজ্ঞা বোবা হয়ে যাবে আর তোমার অঙ্গসমূহ ইবাদতের কাজে ব্যর্থ হবে।’
রোযা : ন্যূনতম আহার, সর্বাধিক শক্তি
হযরত আনাস ইবনে মালেক বর্ণনা করেন : একবার ফাতেমা আলাইহাস সালাম নবীজী (সা.)-এর নিকট আসলেন এবং একখানা রুটি আনলেন। তিনি বললেন : ‘এ রুটি কেন?’ ফাতেমা বললেন : ‘কয়েকটি রুটি তৈরি করেছিলাম। মন চাইল আপনার জন্য নিয়ে আসি।’ নবীজী বললেন : ‘এটাই হলো প্রথম খাবার যা তিন দিন পর তোমার পিতার পেটে যাবে। জেনে রাখ, ক্ষুধার্ত থাকা এ জাতির বৈশিষ্ট্য। এটা তাদের সংগ্রামের একটি স্তম্ভ। সাধনাকারীরা এই পথেই এমন মর্যাদায় উপনীত হয়েছে। তারা আহার থেকে বিরত থেকেছে। হিকমতের দৃষ্টিশক্তি তারা ক্ষুধার মাঝেই খুঁজে পেয়েছে…।’  এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) ক্ষুধায় দিনাতিপাত করতেন। ক্ষুধার জ্বালা হ্রাস করার জন্য তিনি পেটে পাথর বেঁধে রাখতেন।
অথচ হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত রয়েছে : ‘যুদ্ধের ময়দানে আমরা যখন শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে পারতাম না তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আশ্রয় নিতাম। ন্যূনতম আহার গ্রহণ করেও সর্বোচ্চ শক্তি অর্জনের এ পথ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা। রোযা পালনের মাধ্যমে মুমিন বান্দা তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। মূলত রোযা এ জন্যই। মানুষ অপার্থিব সত্তাসম্পন্ন সৃষ্টি। তার পার্থিব প্রয়োজনটুকু কেবল একারণে যে, সে আপাতত এখানে অবস্থান করছে। তার আসল নিবাস জড়জগতের ঊর্ধ্বে। নিঃসন্দেহে যখন সে এ জড়জগৎ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখবে তখন নিজেকে অদৃশ্যলোকে দেখতে পাবে। সে অদৃশ্যলোকের অস্তিত্বসত্তা। তাই সেখানেই নিজেকে অনুভব করবে। এ শক্তি তাকে অর্জন করতেই হবে। অন্তরায় কেবল পার্থিব কালিমা ও পাপ। ইমাম সাদিক (আ.) বলেন : ‘তোমাদের এটা বুঝতে হবে যে, তোমরা গোনাহর ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছ। সুতরাং … وَ اَنْزِلْ نَفْسَكَ مَنْزِلَةَ الْمَرْضي، لا تَشْتَهِي طَعاماً وَلا شَراباً، مُتَـوَقِّـعاً في كُلِّ لَحْظَةٍ شِفَاءَ كَ مِنْ مَرَضِ الذُّنُوبِ ‘…নিজেকে একজন রোগীর অবস্থানে বিবেচনা করো, যে কোন খাদ্য ও পানীয়ের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। আর প্রতিটি মুহূর্তে কামনা করো তোমার গোনাহর ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভের।’  অর্থাৎ রোযা পালনের সময় এরূপ অবস্থা ধারণ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণিত : মি’রাজের রাতে আমি বললাম : یَا رَبِّ وَ مَا مِیرَاثُ الصَّوْمِ قَالَ الصَّوْمُ یُورِثُ الحِکْمَةَ وَ الحِکْمَةُ تُورِثُ الْمَعْرِفَةَ وَ الْمَعْرِفَةُ تُورِثُ الْیَقِینَ فَإِذَا اسْتَیْقَنَ الْعَبْدُ لَا یُبَالِی کَیْفَ أَصْبَحَ بِعُسْرٍ أَمْ بِیُسْرٍ –  হে প্রতিপালক! রোযাদারির সুফল কী? আল্লাহ বললেন : রোযা হিকমতের জন্ম দেয়। আর হিকমত ‘মারেফাত’-এর জন্ম দেয়। আর মারেফাত ‘ইয়াকীন’-এর জন্ম দেয়। অতঃপর বান্দা যখন ইয়াকীন অর্জন করে তখন সে আর পরোয়া করে না কীভাবে তার জীবন কাটছে, সুখে নাকি কষ্টে।’
কি সেই শক্তি?
রোযার আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ সেই শক্তির কথা বলে দিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন : لعلكم تتقون – ‘…হয়তো তোমরা তাকওয়াপরায়ণ হবে।’  আল্লামা তাবাতাবাঈ তাফসীরুল মীযান গ্রন্থে এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন : ‘ইসলামের সুমহান শিক্ষা এবং পর্যাপ্ত বয়ানসমূহ এটাই প্রতিপন্ন করে যে, মহামহিম আল্লাহর কুদ্সী মাকাম কোন কিছুর প্রতি অভাব বা প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। অতএব, ইবাদতের সুফল শুধু বান্দার প্রতিই প্রত্যাবর্তন করে, আল্লাহর প্রতি নয়। বান্দার গোনাহর ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। রোযার সুফল সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন : لعلكم تتقون -‘…হয়তো তোমরা তাকওয়াপরায়ণ হবে।’ অর্থাৎ এ বিধান প্রর্বতন করা হয়েছে এজন্য যাতে তোমরা শুদ্ধাচারী হতে পার। এমন নয় যে, তোমাদের রোযা পালনের প্রতি আল্লাহ মুখাপেক্ষী। তবে রোযা পালন থেকে যে তাকওয়ার আশা করা যায়, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কেননা, মানুষ এ ব্যাপারটি স্বীয় ফিতরাত তথা সহজাত প্রবৃত্তিতে উপলব্ধি করে থাকে যে, কেউ যদি কুদসী জগতের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং পুণ্যময় স্তরে উপনীত হতে চায় তার জন্য সর্বপ্রথম যে জিনিসটি দরকার তা  হলো কামনার দাসত্ব পরিহার করা এবং অবাধ্য নাফসানী প্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরা। অর্থাৎ যা কিছুই তাকে আল্লাহর পথে বাধা প্রদান করে তা থেকে বিরত থাকা। এ হলো তাকওয়া। কামনাকে পরিহার এবং নাফসানী প্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে এ শক্তি অর্জিত হয়। আর যে জিনিসটি মানুষের সর্বসাধারণ অবস্থার সাথে উপযুক্ত তা  হলো সকলের জন্য যে কাজগুলো নিত্য প্রয়োজন, যেমন পানাহার করা ও যৌন চাহিদার বৈধ নিবৃত্তি ইত্যাদি কাজগুলো হতেও বিরত থাকা, যাতে এরূপ অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছাশক্তি বলীয়ান হয়। নাফসের প্রচ- দাপটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ইসলামে ‘জিহাদে আকবার’ তথা বড় জিহাদ হিসাবে গণ্য। এ জিহাদে বিজয় অর্জনের জন্য প্রয়োজন অবিচলতা ও দৃঢ় প্রত্যয়ের। মুমিন-মুসলমানগণ রোযা পালনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে স্বীয় নাফসানী কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং নিজের সামান্য মূল্যের স্বভাব-প্রবৃত্তিগুলোর বিপরীতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মাসুম ইমামগণ বলেছেন : মানুষদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে নাফসানী প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। আর সেই সর্বাধিক শক্তিমান যে ঐ প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হয়। রোযা যদি মানুষকে এই পর্যায়ে উন্নীত না করে তাহলে তা পূর্ণাঙ্গ রোযা নয়। আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব বলেছেন : ‘পেটের রোযার চেয়ে জিহ্বার রোযা আর জিহ্বার রোযার চেয়ে অন্তঃকরণের রোযা বেশি উত্তম।’
আর বর্তমানকালের মহান সাধক, তাকওয়া ও পরহেযগারির মূর্ত প্রতীক মরহুম আয়াতুল্লাহ বাহ্জাত (আর তাঁর মাকামকে উন্নীত করুন) এ সম্পর্কে বলেন : “তাকওয়া হচ্ছে গোনাহর কাজে লিপ্ত না হওয়া। সবাই জিজ্ঞেস করে, কী করব। আমি বলি, বরং বল, কী করব না। উত্তর হচ্ছে : ‘গোনাহ করো না।”
উপসংহার
রমজানের এক মাস মুমিনের আত্মশুদ্ধি ও আত্মিক উন্নয়নের সুবর্ণ সুযোগ। এ মাসে মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহে শয়তান শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে এবং মুমিনের জন্য এ বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়। আল্লাহর বান্দাগণ মাসব্যাপী স্বয়ং আল্লাহর মেহমান হয়ে তাঁরই বিছানো নেয়ামত ভরা দস্তরখানায় বসার সৌভাগ্য লাভ করে। এ দস্তরখানা বিশাল বিস্তৃত, এর নেয়ামতরাজি অপার্থিব, অপরিমেয়। শুধু আত্মপ্রবঞ্চনাকারী ক্ষতিগ্রস্তরাই এই দস্তরখানায় শামিল হয় না। শবে কদরে অশ্রুসিক্ত নয়ন রমজানের দীর্ঘ উপবাসের পথ ধরেই অর্জিত হয়। অন্তর কোমল হওয়া চাই- যে অন্তর কোমল হয়, অশ্রুও ঝরায়। আর অশ্রু ঝরা মানে অদৃশ্যের দরজা তার জন্য খুলে যাওয়া। আর যার জন্য অদৃশ্যের দরজা খুলে গেল সে দুনিয়ার জন্য দুঃখ করে না। তার অনুভব ও উপলব্ধিই বদলে যায়। ফলে রমজান শেষ না হতেই একজন মুমিন নিজেকে নতুন রূপে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। সে দেখতে পায় যে, তার কাম-লালসা ও কু-প্রবৃত্তির মৌনতার রাজ্যে এখন শুধু তাকওয়ার রাজত্ব। সেখানে সবকিছুই অনুসৃত হচ্ছে খোদায়ী নিয়ম-নির্দেশমাফিক। প্রাণে সঞ্চারণ হচ্ছে পবিত্র নূরের স্ফূরণ। অন্তঃকরণ জুড়ে বিরাজ করছে এক অপার্থিব বিশুদ্ধতা। রোযার মাধ্যমে অর্জিত এ সূচিতার ছায়াতলে সে তখন আল্লাহ প্রদত্ত স্বজ্ঞাক্রমে কেবল নিজের পেট ও মুখকেই পানাহার থেকে বিরত রাখে না, বরং স্বীয় সমুদয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহ যা বারণ করেছেন তা থেকে বিরত রাখে। এ সাধনার মাধ্যমে সে তাকওয়ার সেই স্তরে উপনীত হতে সক্ষম হয় যেখানে সে এমনকি গোনাহর চিন্তা থেকেও বিরত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এটাই রোযার পরম আলোকচ্ছটা, পূর্ণ আধ্যাত্মিকতার নির্মল অনুভূতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.